


সাবিকুন নাহার ইভা:
ইউরোপে পৌঁছাতে গিয়ে সাগরে ডুবে অসংখ্য অভিবাসীর মৃত্যুর দৃশ্য আমরা প্রায়ই দেখি। অভিবাসী বহনকারী নৌকা ডুবে ছোট্ট সিরীয় শিশু আইলান কুর্দির মৃত্যুর ছবি এখনও বিশ্ববাসীর মনে গভীর বেদনা জাগায়।
নানা কারণে মানুষ ইউরোপমুখী হয়। কেউ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ছেড়ে বাঁচার আশায় পাড়ি জমায়, কেউ রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে মুক্তি চায়। তৃতীয় বিশ্বের বহু মানুষের কাছে ইউরোপে বসবাস যেন এক স্বপ্নের নাম। কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়ে থেকে যায়, কেউ বৈধ ভিসায় গিয়ে সুযোগ খোঁজে, আবার কেউ জীবিকার তাগিদে অনিশ্চিত পথে পা বাড়ায়, কেউ আবার উন্নত জীবনের স্বপ্নে ঝুঁকি নেয়।
ভিন্ন এক বাস্তবতা:
সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধান সামনে এনেছে ভিন্ন এক চিত্র। বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পাওয়ার জন্য নিজেদের “সমকামী”, “নাস্তিক” হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে অনেক বাঙালিরা। দেশে ফিরলে তারা নির্যাতনের শিকার হবেন এমন দাবি করে কর্তৃপক্ষের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছেন।
অনুসন্ধান বলছে, কিছু অসাধু আইনজীবী ও ইমিগ্রেশন উপদেষ্টারা অভিবাসীদের এসব ভুয়া গল্প তৈরি করে দিচ্ছেন। বিশেষ করে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থী, কর্মজীবী বা পর্যটকদের লক্ষ্য করে এই চক্র কাজ করছে। তাদের শেখানো হচ্ছে, কীভাবে নিজেদের “সমকামী”, “নাস্তিক” হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি করতে হবে যে নিজ দেশে ফিরে গেলে তারা নির্যাতনের শিকার হবেন। শুধু গল্প বানানোই নয় সাজানো প্রমাণপত্র, নকল সমর্থনপত্র এমনকি চিকিৎসা সংক্রান্ত ভুয়া নথি তৈরির দিকনির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে টাকার বিনিময়ে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। কিছু ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের মানসিক রোগের ভান করতে বলা হচ্ছে, এমনকি কেউ কেউ মিথ্যা এইচআইভি (ঐওঠ) পজিটিভ হওয়ার দাবিও করছেন, শুধু আশ্রয় আবেদনকে শক্তিশালী করতে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, কিছু উপদেষ্টা দাবি করছেন, তারা প্রয়োজন হলে সাজানো “সমকামী সঙ্গী” পর্যন্ত জোগাড় করে দিতে পারেন, যাতে আবেদনটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। অথচ এসব আশ্রয় প্রার্থীদের কেউই সমকামী কিংবা নাস্তিক নয়।
নৈতিক প্রশ্ন:
জীবিকার তাগিদে মানুষ অনেক বড় ঝুঁকিও নেয়, এটি বাস্তবতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটু উন্নত জীবনের লোভে আত্মপরিচয়, বিশ্বাস, মূল্যবোধ সবকিছু বিসর্জন দিতে হবে?
পরিবারের জন্য মানুষ জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকে, কিন্তু নিজের সম্মান, আত্মপরিচয় ও নৈতিক অবস্থানকে অস্বীকার করে বেঁচে থাকা কি সত্যিই বাঁচা? শুধু ইউরোপে বাসের জন্য এমন কিছু দাবি করা যায় যা নিজের সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি, বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক? এটি কেবল আইনি অপরাধই নয়, এটি আত্মসম্মানেরও গভীর সংকট নির্দেশ করে।
ভয়ের বিষয়:
উগ্রপন্থী দেশ হিসেবে পূর্ব থেকেই পাকিস্তানের দুর্নাম রয়েছে। ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে, পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশও যে গ্লোবালি উগ্রপন্থীর তালিকায় নিজের নাম তুলে ফেলেছে তা অজানা ছিল। এই প্রতিবেদন প্রমাণ করছে যে, অভিবাসী প্রত্যাশীরা এসব নকল পরিচয়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করছে। তারা নিজেদের ‘সমকামী’ বা ‘নাস্তিক’ পরিচয় দিচ্ছে এবং বাংলাদেশে তারা অনিরাপদ বলে দাবি করছে। অর্থাৎ একটি উগ্রপন্থী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করছে। আর কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশকেও উগ্রপন্থী রাষ্ট্র হিসেবে মনে করছে বলেই তাদের প্রাণের আশঙ্কার কথা বিবেচনা করে তাদের দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আর পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশও উগ্রপন্থী বলে পরিচিত বলেই আইনজীবী ও ইমিগ্রেশন উপদেষ্টারা এই দেশের অভিবাসীদের এই অভিনব পদ্ধতি এপ্লাইয়ের পরামর্শ দিচ্ছে।
প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না! পরে ভেবে দেখলাম, বাংলাদেশে উগ্রপন্থীরা যেভাবে দাপিয়ে বেড়ানো শুরু করেছে তাতে আন্তর্জাতিক মহলে ভালো বার্তা যাবার কথা নয়। দেশটাকে উগ্রপন্থী ট্যাগ দিতে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র তাহলে সফলের পথে।
বৃহত্তর প্রভাব:
এই ধরনের প্রতারণা শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের ভাবমূর্তির উপরও এর প্রভাব পড়ে। প্রভাব পড়ে প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের বিশ্বাসযোগ্যতার উপর এবং পুরো আশ্রয় ব্যবস্থার উপর। যারা সত্যিকার অর্থে নির্যাতনের শিকার হয়ে আশ্রয় চান, তাদের আবেদনও তখন সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়।
আজ আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে ইউরোপে থাকার আশায় কেউ কেউ জীবনই নয় কেবল মান-মর্যাদাও বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। কিন্তু মনে রাখা দরকার জীবন শুধু টিকে থাকার নাম নয়, এটি সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার নাম। অতীতে শোষণ-নির্যাতনের মুখেও মানুষ মাথা নত করেনি যে জাতি; তাদের আজকের এই প্রবণতা আমাদের সেই ইতিহাস, জাতির আত্মপরিচয়কে কালিমা লিপ্ত করে। প্রশ্নটা তাই শুধু অভিবাসন নয়, প্রশ্নটা আমাদের আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ এবং আমরা আসলে কী হয়ে উঠছি সেটি নিয়ে।
ইতিহাসের আয়নায়:
একটু পেছনে ফিরে তাকালেই দেখতে পাবো যে, এই ইউরোপিয়ানরা কয়েকশ বছর আগেও একটি অসভ্য জাতি ছিল। গরু-ছাগলের মতো হাটে নিয়ে মানুষ বেচাকেনা করত। এক পর্যায়ে জীবিকার তাগিদে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পাড়ি জমায়। আমাদের উপমহাদেশে এসেও ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করে। ব্যবসার নামে একটা পর্যায়ে ছলেবলে কৌশলে তারা এদেশটাকে দখল করে। জাহাজ ভরে ভরে এদেশের সম্পদ লুট করে ইউরোপে নিয়ে জমা করে। তাদের তৈরি কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে ৩ কোটি ভারতবাসী অনাহারে মারা যায়। সেখানকার আকাশছোঁয়া অট্টালিকাগুলোতে আমাদের দাদা-পরদাদাদের রক্ত ও ঘাম মিশে আছে।
ব্রিটিশরা উপমহাদেশ দখলের পর শিক্ষাবিদ জন ম্যাকলেকে যখন পাঠালেন এ উপমহাদেশের সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে তখন তিনি পুরো ভারতবর্ষ ঘুরে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের কাছে যে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন সেটি তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক মনে করছি।
“আমি ভারতের এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরে বেড়িয়েছি কিন্তু একটি ভিক্ষুকও আমার চোখে পড়ে নি, একটি চোরও আমি দেখতে পাইনি। এ দেশে সম্পদের এত প্রাচুর্য এবং এদেশের মানুষগুলি এতটাই যোগ্যতাসম্পন্ন ও উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী যে এদেশকে আমরা কখনোই পদানত করতে পারবো না যদি না তাদের মেরুদণ্ডটি ভেঙ্গে ফেলতে পারি। এদেশের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই হচ্ছে সেই মেরুদণ্ড। এ কারণে আমার প্রস্তাব হচ্ছে, আমরা এখানকার প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা, সংস্কৃতিকে এমন একটি শিক্ষা ও সংস্কৃতি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যাতে প্রতিটি ভারতীয় নাগরিক ভাবতে শেখে যে, যা কিছু বিদেশি এবং ইংরেজদের তৈরি তা-ই ভালো এবং নিজেদের দেশের থেকে উৎকৃষ্টতর। এভাবে নিজেদের উপরে শ্রদ্ধা হারাবে, তাদের দেশজ সংস্কৃতি হারাবে এবং এমন একটি দাসজাতিতে পরিণত হবে ঠিক যেমনটি আমরা চাই।”
শিক্ষা-জ্ঞানে, সভ্যতায়, সম্পদে, সম্প্রীতিকে সমৃদ্ধ একটি জাতির আজ এই অধঃপতন। তারা প্রথমে ষড়যন্ত্রমূলক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে জাতিকে দাস বানিয়েছে। এরপর ২০০ বছর শোষণ করেছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কে দিয়ে জাতির মধ্যকার সম্প্রীতি বিনষ্ট করেছে। সবশেষে দলাদলি হানাহানির রাজনৈতিক সিস্টেম দিয়ে গিয়ে জাতিটাকে ঐক্যহীন করে দিয়ে গিয়েছে। আর ধর্মহীন বস্তুবাদী প্রগতির লোভ দেখিয়ে মানুষের নৈতিকতার অধঃপতন ঘটিয়েছে।
তারা চলে গেছে প্রায় ৮০ বছর কিন্তু তাদের কুশিক্ষার প্রভাব আজও কাটেনি। ভিতরের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সহিংসতা এবং এই রিপোর্টে আসা নৈতিক স্খলণের রূপ তারই প্রমাণ বহন করছে।
আজ একটু উন্নত জীবনের আশায় তাদের দেশে আশ্রয় পেতে আমরা কত নিচে নামতেও রাজি। জান দিয়ে দিচ্ছি, মান দিয়ে দিচ্ছি। অথচ তারা যখন আমাদের উপরে অত্যাচার, নির্যাতন, লুটপাট চালাতো তখন আমরা আত্মমর্যাদাকে বিকিয়ে না দিয়ে লড়েছি। আমাদের স্লোগান ছিল- ‘জান কবুল আর মান কবুল, আর দেব না আর দেব না রক্তে ভেজা ধান মোদের প্রাণ হো’। [লেখক: শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ।]