


ওবায়দুল হক বাদল:
আমরা বাঙালিরা আর কিছু শিখি বা না শিখি, “সিন্ডিকেট” নামের বিষয়টি যেন বেশ ভালোভাবেই আয়ত্ত করেছি। দেশের সঙ্কটকালীন পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে মজুদ বাণিজ্য করা; এ যেন আমাদের এক অদ্ভুত দক্ষতা। মানুষের অসহায়ত্বকে কেন্দ্র করে কীভাবে অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করা যায়, সে কৌশলে আমরা ক্রমেই পারদর্শী হয়ে উঠছি। দুঃখজনক হলেও সত্য, এটি এখন আর কেবল একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রায় সবার মধ্যেই এই প্রবণতা কমবেশি দেখা যায়। যেন এটি ধীরে ধীরে একটি জাতিগত স্বভাবে পরিণত হচ্ছে। যে যার অবস্থান থেকে সুযোগকে কাজে লাগাতে ব্যস্ত।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। এমন এক সংকটময় সময়ে, একশ্রেণির ব্যবসায়ী জ্বালানি তেল মজুদের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। গত ৩ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুদ করে রাখা প্রায় সাড়ে ৫ লাখ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে, পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে মোটরসাইকেল ও গাড়ির চালকদের। প্রতিদিন ২-৫ কর্মঘণ্টা পুড়ছে মানুষের।
এ দৃশ্য নতুন নয়। এর আগেও আমরা আলু, পেয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুদের ঘটনা দেখেছি। করোনা মহামারির সময় ঘটে যাওয়া নানা অনিয়ম ও সুযোগসন্ধানী আচরণ এখনো মানুষের স্মৃতিতে তাজা। প্রতি বছর রমজানকে কেন্দ্র করে বাজারে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, সেটিও যেন এক নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে এর প্রভাব ভয়াবহ রকমের।
আর এই সিন্ডিকেট মানসিকতা কেবল বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সমাজের প্রায় সব স্তরেই এর বিস্তার ঘটেছে। প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে সংকটকে সুযোগে পরিণত করতে চায়। অবরোধ, ধর্মঘট, হরতাল কিংবা কোনো দুর্যোগের সময় বড় যানবাহন বন্ধ হয়ে গেলে যাত্রীদের চাপ পড়ে ছোট যানবাহনের উপর। এই সময়ে রিকশা ও অটোরিকশার মতো ছোট বাহনের চালকদের বসে থাকতে হয় না, বরং তারা বাড়তি ট্রিপ পান। সাধারণত দিনে যেখানে ২০টি ট্রিপ হয়, সেখানে এমন পরিস্থিতিতে ৩০-৪০টি ট্রিপও হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনায় ভাড়া কিছুটা কম রাখা সম্ভব হলেও বাস্তবে দেখা যায় উল্টো চিত্র। তারা যাত্রীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ৫০ টাকার ভাড়া পারলে ১০০ টাকা করে দেন।
শুধু সংকটকালেই নয়, উৎসবের সময়ও এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঈদ, পূঁজা-পার্বণ, বসন্ত, বৈশাখ কোনোকিছুই রেহাই পায়না আমাদের হাত থেকে। একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে কাফনের কাপড়ের গজের দাম বেড়ে কত হয়ে যাবে আল্লাহ মালুম!
অথচ আমরা কথায় কথায় বড়াই করে বলি এটা ৯২% মুসলমানের দেশ! এই কি তাহলে আমাদের মুসলমানের পরিচয়! মুসলমাদের চরিত্র কি এমন হবার কথা?
রসুল (সা.) ১৪০০ বছর আগে যে ইসলামের আদর্শ প্রচার করেছেন, সেই আদর্শ পেয়ে আরবের আইয়্যামে জাহেলিয়াতের মানুষও সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আমরা সেই আদর্শের অনুসারী দাবি করেও আমাদের এমন নৈতিক স্খলন কেন?
আমাদের ওয়াজ মাহফিলগুলোতে এত ওয়াজ হচ্ছে এত নসিয়ত হচ্ছে কিন্তু জাতি হিসেবে আমাদের নৈতিক অবক্ষয় যেন দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। এর কারণ কি? আমরা কি ইসলামের প্রকৃত আদর্শ ধারণ করি নাকি ইসলামের নামে নকল একটা পোশাকি ইসলামকে আকড়ে ধরে আছি? বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে। ভাবার সময় হয়েছে।
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। সময় এসেছে নিজেদের ভেতরে তাকানোর, আত্মসমালোচনা করার। কারণ পরিবর্তন শুরু হতে পারে কেবল তখনই, যখন আমরা নিজেরাই আমাদের ভুলগুলো স্বীকার করতে প্রস্তুত হব।