


অন্তর্বর্তী সরকারের আমলকাল ভিন্নমতের মানুষের কেটেছে মব আতঙ্কে। অনেকের কাছে সময়টাকে একটা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়। অন্তুর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আইনের শিক্ষক আসিফ নজরুল স্যার ক্ষমতা ছাড়ার পর অবলিলায় বলেছেন যে, ‘মব ঠেকাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি’। তার এই সরল স্বীকারোক্তি মানুষ সাদরে গ্রহণ করেনি। মানুষ ধিক্কার জানিয়েছে! ব্যর্থতাকে কখনো কেউ সম্ভাষণ জানায়ও না।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন আর মব হবে না। তার ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্য, পান্ডিত্যের উপর আস্থা রাখে মানুষ। মানুষ আশ্বস্ত হয়েছিল, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল।
কিন্তু এই সরকারের আমলেও আমরা মবের ঘটনা ঘটতে দেখেছি। যদিও তা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের তুলনায় নিছক কম। কিন্তু মবের ঘটনা ঘটেছে।
রুমিন ফারহানা সংসদে যখন এবিষয়ে কথা তোলেন তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখেছি সন্ত্রাসী এসব ঘটনাকে ক্লারিফাই করতে। কোনটা মব কোনটা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তার শ্রেণিবিভাগ নিয়ে কথা বলতে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক পীরের বক্তব্যের খণ্ডাংশ প্রচার করে জনতা উত্তেজিত করে উগ্রগোষ্ঠীকে একটি মাজারে হামলা করে ভাংচুর, লুটপাট চালাতে দেখেছি আমরা। সেখানে পীর শামিমরেজাকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে, কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকেও দেখেছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুরে কথা বলতে। তিনি বলেন, ‘কুষ্টিয়ার ঘটনা ‘মব’ নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা’।
মব না বলে আপনি এর অন্য নাম দিতে পারেন। ক্যাটাগরি করতে পারেন! ক্লাসিফাই করতে পারেন! কিন্তু আরো একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটল তো! আরো একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সাক্ষী হলো তো দেশবাসী! অন্য নাম না হয় দিলেন কিন্তু তাতে কি ব্যর্থতার দায় এড়ানো যায়?
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, এঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। এ বিষয়ে সবাই একমত। যদি তৎক্ষণাৎ ঘটনা না হয়ে পূর্বপরিকল্পিত হয়ে তাকে তাহলে ব্যর্থতার দায় তো আরো বেশি বর্তায়।
ঘটনাটি যে পূর্বপরিকল্পিত ছিল তা কারো অজানা নয়। খুবই ঠাণ্ডা মাথায় সুপরিকল্পিতভাবে এই আগ্রাসন চালায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীটি। প্রথমে ২০২১ সালে পীর শামিম রেজার দেওয়া একটা বক্তব্যের খণ্ডাংশ সামনে এনে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে হামলার ছক আঁকা হয়। হামলার আগে তারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জনতা একত্রিত করে, উত্তেজিত জনতা নিয়ে মিছিল দেয়, হামলা চালায়।
হামলার প্রস্তুতির ব্যাপারে প্রশাসনও অবগত ছিল। সেই মাজারে পুলিশের অবস্থানও ছিল। কিন্তু তারা উন্মত্ত জনতাকে ঠেকাতে ব্যর্থ হয়! যদিও প্রশাসন বলছে, আমাদের যথেষ্ট ফোর্স সেখানে ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই ব্যর্থতার দায় কে নেবে?
তবে পরবর্তীতে একই এলাকার বাউল সাধক শফি মন্ডলের বাড়িতে হামলার আশঙ্কায় পুলিশের শক্ত অবস্থান নিতে দেখা গেছে; যা প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে পেতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এমন শক্ত অবস্থান শামীম রেজার মাজারকে কেন্দ্র করে কেন নেওয়া হয়নি?
পীর শামিম রেজার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সে ধর্ম অবমাননা করেছে। ভাই, আমিও মুসলমান। ইসলামকে নিয়ে, আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সা.) নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে আমারও লাগে। ভীষণভাবেই লাগে। কিন্তু কেউ যদি সত্যিই এমন কাজ করে থাকে; তার মূর্খতার জন্য, তার অন্যায়ের জন্য আইন-আদালত আছে। ধর্ম অবমাননা, ধর্মানুভূতিতে আঘাত এসব বিষয়ে যেহেতু আইন আছে, শাস্তির বিধান আছে সেখানে আইন হাতে তুলে নেয়াটা সভ্যতার পরিচয় হতে পারে না। তাছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে পৃথিবীর কোনো সংবিধান যেমন অনুমতি দেয় না তেমনি ইসলামও দেয় না।
তাছাড়া এই শামিম রেজার বিরুদ্ধে ২০২১ সালে একই অভিযোগে মামলা হয়। সে জেলও খাটে। জেল খেটে বের হয়ে যদি সে একই ধরনের কাজ আবার করে তাহলে তার বিরুদ্ধে আবার মামলা হতে পারে। দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত তাকে আবার শাস্তির আওতায় আনবে। কিন্তু আপনি আমি বিচারক হয়ে এমন উগ্রতা দেখাতে পারি না। এটা আল্লাহ ও আল্লাহর রসুলের শিক্ষা নয়, ইসলামের শিক্ষা নয়। কে বোঝাবে এদের, এতে করে ইসলামের দুর্নাম হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড সুমহান ইসলামের উপর কালিমা লিপ্ত করার অপচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়।
সংবাদপত্রে প্রকাশ, কুষ্টিয়ার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো গ্রেফতার হয়নি কেউ। পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হোক কিংবা মব, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। আসামিদের একজনকে প্রকাশ্যে ঘুরতে দেখা গেছে এলাকায় -এমন তথ্য জানিয়েছে স্থানীয় সাংবাদিকরা। এব্যাপারে প্রশাসনের সর্বোচ্চ তৎপরতা কামনা করছে মানুষ। দ্রুত অপরাধীদের গ্রেফতার করে শাস্তি আওতায় আনা গেলে প্রশাসনের হারানো ইমেজ উদ্ধারে সহায়ক হবে।
তবে যাই হোক একটা বিষয় কিন্তু পরিষ্কার, সরকারগুলো বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। তারা কথা দিয়ে কথা রাখছে না অথবা কথা রাখতে পারছে না। মানুষ তাদের বিশ্বাস করছে আর তারা প্রতিবারই মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গ করছে।
জগতে কেউ কথা রাখেনি! কেউ কথা রাখে না! কিন্তু তবুও মানুষ বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত। কাউকে না কাউকে তো বিশ্বাস করতেই হবে। বর্তমান সরকারের কাছে এমন কোনো কাজ কেউ আশা করে না যাতে মানুষের বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে যায়। আর যেন এমন নৃশংসতার সাক্ষী বাংলার মানুষ না হয় সে ব্যাপারে সরকার যত দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে ততই জাতি ও সরকার উভয়ের জন্য মঙ্গল।