Date: April 19, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / সারাদেশ / ঢাকা / বাঁশের ঠেকায় দাঁড়িয়ে চার শতাব্দীর ইতিহাস - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

বাঁশের ঠেকায় দাঁড়িয়ে চার শতাব্দীর ইতিহাস

April 19, 2026 12:12:23 PM   শাহাদৎ হোসেন
বাঁশের ঠেকায় দাঁড়িয়ে চার শতাব্দীর ইতিহাস

১৮ এপ্রিল ছিল বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস। যখন পুরনো স্থাপত্য আর ইতিহাস রক্ষার নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তখন টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদার বাড়ির অন্যতম প্রধান অংশ ‘দাউদ মহল’ ধুঁকছে চরম অবহেলায়। ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ভবনটি কেবল একটি পুরনো দালান নয়, এটি বাংলার শেষ স্বাধীন আফগান সুলতান কররানি রাজবংশের উত্তরসূরিদের স্মৃতিবিজড়িত এক জীবন্ত দলিল। তবে সঠিক সংস্কারের অভাবে এই গৌরবময় স্থাপত্য এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

টাঙ্গাইল শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জমিদার বাড়িটি বাংলার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইতিহাস থেকে জানা যায়, পন্নী বংশের ১১তম পুরুষ জমিদার দেওয়ান সাদত আলী খান পন্নী ১৮৫৪ সালে করটিয়ায় তাঁর জমিদারির সেরেস্তা ও আবাস ভবন হিসেবে এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেন। তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ সুলতান দাউদ খান কররানির নামানুসারে এর নামকরণ করেন ‘দাউদ মহল’। এটি মূলত ইন্দো-ইসলামিক ও ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ০.৫ কিলোমিটার প্রস্থের প্রাচীরঘেরা এই বিশাল চত্বরে রয়েছে লোহার ঘর, রোকেয়া মহল, রাণীর পুকুরঘাট ও মোগল স্থাপত্যের আদলে গড়া মসজিদ।

সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের অবহেলা আর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দাউদ মহলের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ভবনের ছাদ ধসে পড়ার উপক্রম হওয়ায় তা কোনোমতে বাঁশ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। দেয়ালে লোনা ধরে প্রাচীন সব কারুকাজ দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ ঘরই এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের শেষ দিকে করটিয়া জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য রক্ষায় এক নতুন আশার আলো দেখা দেয়। গত ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে ওয়াকফ প্রশাসক কর্তৃক ডা. উম্মুত তিজান মাখদুমা পন্নী ‘মোহাম্মদ হায়দার আলী খান পন্নী ওয়াকফ আল আওলাদ এস্টেট’-এর নতুন মোতাওয়াল্লী নিযুক্ত হন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি এই জীর্ণপ্রায় ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছেন।

জানা গেছে, তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইতোমধ্যে দুই কোটি টাকারও বেশি নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করেছেন, যাতে এই প্রাচীন জমিদার বাড়ির হারানো শ্রী ফিরিয়ে আনা যায়। তাঁর এই বিপুল প্রচেষ্টায় স্থাপনাটির চারপাশের পরিবেশে দৃশ্যমান পরিবর্তন এলেও শত বছরের পুরনো এই বিশাল ও সংবেদনশীল দালানগুলোর পুরোপুরি সংস্কার করা একক প্রচেষ্টায় প্রায় অসম্ভব। দাউদ মহলের মতো প্রাচীন স্থাপনার বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ ও এর আদি স্থাপত্যশৈলী বজায় রেখে মেরামত করার জন্য যে বিশাল ব্যয় ও কারিগরি দক্ষতা প্রয়োজন, তা কোনো ব্যক্তিগত এস্টেটের পক্ষে জোগান দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। ফলে ডা. মাখদুমা পন্নীর এই ব্যক্তিগত বিনিয়োগের পাশাপাশি এখন জরুরি ভিত্তিতে সরকারি আর্থিক অনুদান এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের মনেও এই ঐতিহ্য নিয়ে রয়েছে নানা আক্ষেপ। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা বলেন, এই জমিদার বাড়ির সঙ্গে আমাদের বাপ-দাদাদের শৈশব আর আবেগ জড়িয়ে আছে। ঠিকমতো মেরামত করলে এটি টাঙ্গাইলের সবচেয়ে বড় পর্যটন কেন্দ্র হতে পারত। স্থানীয় চিকিৎসক শহীদ মিয়া মনে করেন, করটিয়া জমিদার পরিবার শুধু ঐশ্বর্যের প্রতীক ছিল না, তারা ছিল শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের অগ্রদূত। বাংলার আলীগড় খ্যাত সা’দত কলেজ বা রোকেয়া মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিবারেরই অবদান। দানবীর ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, যাকে সারা বিশ্ব ‘আটিয়ার চাঁদ’ হিসেবে চেনে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর অবদান আজও লন্ডন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। এমন একটি পরিবারের প্রধান আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়া মানে আমাদের শেকড়কে হারিয়ে ফেলা।

অন্যদিকে ইতিহাস সচেতন তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীরাও এই স্থাপনা সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। সা’দত কলেজের শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা বইয়ে অনেক পড়েছি কিন্তু গেট প্রায়ই তালাবদ্ধ থাকায় এর স্থাপত্য কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় না। এই ঐতিহ্যগুলো শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা উচিত।

হায়দার আলী খান পন্নী ওয়াকফ-আল-আওলাদ এস্টেটের মোতাওয়াল্লী ডা. উম্মত তিজান মাখদুমা পন্নী স্থাপনাটির করুণ দশায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর আজ প্রায় ৭৫ বছর পার হয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে ওয়াকফ এস্টেটের স্বল্প আয়ে এই বিশাল ও সংবেদনশীল স্থাপনার বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ বা সংস্কার করা কঠিন। চোখের সামনে আমাদের পূর্বপুরুষদের এই স্মৃতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল একটি বাড়ি নয়, এখানে বহু অলি-আউলিয়া ও দরবেশের পা পড়েছে। তাই এই পবিত্র ভূমির মর্যাদা ও ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।

এস্টেটের মহাব্যবস্থাপক এসএম সামসুল হুদা জানান, আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি, কিন্তু সরকারি সহায়তা ছাড়া এই প্রাচীন স্থাপত্য রক্ষা করা কঠিন। দাউদ মহল ধসে পড়লে টাঙ্গাইলের ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায় হারিয়ে যাবে। দাউদ মহলের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং বড় ধরনের ধস ঠেকাতে সরকারি হস্তক্ষেপ এখন অপরিহার্য।

প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি যদি যথাযথভাবে সংস্কার করা যায়, তবে এটি শুধু পন্নী পরিবারের ইতিহাসই নয়, বরং টাঙ্গাইল তথা সমগ্র বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক বড় সম্পদ হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে। বিশ্ব ঐতিহ্য দিবসের প্রত্যাশা ছিল, দাউদ মহল ফিরে পাবে তার হারানো জৌলুস।