


চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি:
চুয়াডাঙ্গায় ‘সংকট মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তাবনা- রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হোক আল্লাহর তওহীদ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বর্ণাঢ্য ঈদ পুনর্মিলনী ও কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল ২০২৬) চুয়াডাঙ্গা শহরের মুক্তমঞ্চ মাঠে আয়োজিত এই সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন হেযবুত তওহীদের সর্বোচ্চ নেতা এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম।
বক্তব্যের শুরুতেই এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বর্তমান মুসলিম বিশ্বের চরম সংকট ও দুর্দশার জন্য অনৈক্যকে দায়ী করে বলেন, “অনৈক্যের কারণেই আজ সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো একের পর এক মুসলিম রাষ্ট্র ধ্বংস করছে। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ দিলেও আমরা তা মানছি না।”
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি বলেন, দেশে ঘন ঘন সরকার বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের প্রকৃত উন্নয়ন হচ্ছে না। শান্তি-নিরাপত্তার পরিবর্তে মানুষ বরং আরও আতঙ্কের মধ্যে পড়ছে। এর কারণ হিসেবে তিনি প্রচলিত ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থাকে দায়ী করেন এবং বিদ্যমান ‘সিস্টেম’ বা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবি জানান।
তিনি বলেন, ইন্টেরিম সরকার ক্ষমতায় বসার পর রাষ্ট্র সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিলেন। আমিও প্রস্তাব দিলাম। আমার প্রস্তাব ছিল, রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে আল্লাহর হুকুম, আল্লাহর তওহীদ। কারণ এই ভূখণ্ডের মানুষ ধর্মপ্রাণ; তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করেন, রসুলকে (সা.) বিশ্বাস করেন, কোরআন বিশ্বাস করেন। আমরা কোরআনের কাছে সমস্যা, সঙ্কটের সমাধান খুঁজি। পশ্চিমাদের রেখে যাওয়া মানুষের তৈরি জীবনবিধান প্রয়োগ করে দেখেছি আমরা, কোনো ফল পাইনি। এটা প্রতিবারই ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। আর এক্সপেরিমেন্ট এর দরকার নাই।

আল্লাহর নির্দেশিত তওহীদভিত্তিক জীবনব্যবস্থা ব্যতীত ধর্ষণ, খুন, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি বন্ধ হবে না। কোনো অন্যায় দূর করতে পারবেন না। বৈষম্য দূর হবে না, ফ্যাসিজম দূর হবে না। প্রচলিত বিদ্যমান ব্যবস্থা কোনো সঙ্কটেরই সমাধান দিতে পারবে না -বলেন এমাম সেলিম।
হেযবুত তওহীদের এই নেতা বলেন, বিদেশি ঋণের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে সরকার। সরকারের কাঁধে বর্তমানে ৩০ বিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা। ঋণের বোঝা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। এই অর্থবছর শেষে বাংলাদেশকে দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ মেটাতে সব মিলিয়ে ৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। পরিস্থিতি সামলাতে টাকা ছাপাচ্ছে সরকার। এতে করে আবার মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিবে। এগুলো আসলে কোনো সমাধান নয়। আল্লাহর দেওয়া সুদবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হবে। এসব সঙ্কট থেকে মুক্তি মিলবে।
‘বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হবে আল্লাহর তওহীদ। আল্লাহর হুকুম। আল্লাহর হুকুম দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। যতদিন আমরা পশ্চিমাদের দেওয়া জীবনব্যবস্থার বলয়ে, মানবসৃষ্ট সিস্টেমের মধ্যে আছি ততদিন এসব সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বারং সঙ্কট দিন দিন আরো ঘনিভূত হবে।’
তিনি বলেন, ভিতরে ভিতরে দেশের সম্পদ লুট হয়ে গেছে, ব্যাঙ্কের টাকা পাচার হয়ে গেছে, আপনার আমার পকেটের টাকা ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। যদি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হয় তাহলে একটা গুরুতর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আল্লাহর সাথে করা অঙ্গীকারে ফিরে যেতে হবে। কালোমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো হুকুম মানব না এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই কথার উপরে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এরপর আল্লাহর হুকুম দীন কায়েমের সংগ্রাম করতে হবে -বলেন তিনি।
‘নামাজ কায়েম যেমন ফরজ তেমনি দীন কায়েম করাও ফরজ। আল্লাহর হুকুম দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করাও ফরজ। শুকরের গোশত খাওয়া যেমন হারাম তেমনি সুদও হারাম। আল্লাহর হুকুম আংশিক মানলে হবে না। আংশিক মানা আর আংশিক না মানাই হচ্ছে শিরক।’
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেন, মক্কার কাফের-মোশরেকরা আল্লাহকে বিশ্বাস করলেও লাত, মানত, উজ্জার পূঁজা করত। আর এখন আমরা মানুষের তৈরি বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্রের পূঁজা করি। আল্লাহর দীনকে পূর্ণাঙ্গ রূপে কায়েম করার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ। আর দীন কায়েম করতে হবে আল্লাহর নির্দেশ ও নীতি মোতাবেক জান ও মাল দিয়ে জেহাদ করে। আল্লাহর রসুল ও তার সাহাবীরা জেহাদ করেই দীন কায়েম করেছেন। রসুল ও সাহাবীদের জেহাদ, আত্মত্যাগের কারণেই আজ আমরা মুসলমান।
জেহাদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জেহাদ মানে সন্ত্রাসবাদ বা আতঙ্ক সৃষ্টি নয়। জেহাদ হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার পবিত্র সংগ্রাম।” সমাজ থেকে মাদক, সন্ত্রাস ও অরাজকতা নির্মূলে মোমেনদের জান-মাল দিয়ে নিরলস কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। একইসাথে সংগঠনের বিরুদ্ধে স্বার্থান্বেষী মহলের অপপ্রচারের জবাব দিতে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরামর্শ দেন।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। কিছুদিন পরপরই এমন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সঙ্কটের মুখে পড়ছে দেশ। আর এই সঙ্কট থেকে উত্তরণে হিমশিম খেতে হয় সরকারকে। জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার শুরু হয়ে গেছে অলরেডি। আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তির কারণে কেনাকাটা করতেও এখন তাদের অনুমতি নিতে হচ্ছে। জাতিকে যদি কলেমার অঙ্গীকারের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন তাহলে আমেরিকা-ব্রিটেনের সামনে মস্তক অবনত করতে হবে না। আমরা দৈনিক পাঁচবার যে আল্লাহর সামনে মাথা নত করি কেবল তার সামনেই মাথা নত করব।
সবশেষে তিনি বলেন, জাতীয়, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিকসহ সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানই হতে হবে একমাত্র ভিত্তি। আল্লাহর হুকুমকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে তওহীদের ভিত্তিতে পুরো উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
হেযবুত তওহীদের সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন তার বক্তব্যে বলেন, সরকার গঠনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন আর মব হবে না। কিন্তু আমরা দেখেছি মব বন্ধ হয়নি। ভিন্নমতের মানুষেরা এখনো নিরাপদ নয়। কুষ্টিয়ায় পীরের দরগায় হামলা করে হত্যা, গাজীপুরের কাপাসিয়ায় হেযবুত তওহীদকে উচ্ছেদ করার হুমকি, বরিশালে বিএম কলেজে হেযবুত তওহীদ ছাত্র ফোরামের ছাত্রদের উপর সন্ত্রাসী হামলা হতে আমরা দেখেছি। অপরাধকে এখন ক্লাসিফাই করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যেগুলো পূর্বপরিকল্পিত সেগুলো মব নয় গ্যাং ভায়োলেন্স। যে নামেই সজ্ঞায়িতই করা হোক না কেন সবচেয়ে বড় কথা হচেছ মানুষের নিরাপত্তা নেই।
ফ্যাসিস্ট বলে এক সরকারকে তাড়ানো হয়েছে, এখন শুরু হয়েছে আবার ধর্মীয় ফ্যাসিজম। যেন ধর্মের ঠিকাদারি শুধু ঐ গোষ্ঠীটিই নিয়েছে। তাদের মতের সাথে না মিললেই তাদের উগ্র রূপ বের হয়ে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার এদের সামাল দিতে পারে নাই। কেউই পারবে না। সকল ধর্ম-মতের মানুষ নিশ্চিন্তে ঘরের দরজা খুলে ঘুমাবে; এমন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে একমাত্র ইসলামের প্রকৃত আদর্শ -বলেন তিনি।
চুয়াডাঙ্গা জেলা সভাপতি জুয়েল রানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন হেযবুত তওহীদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নারী বিভাগের প্রধান রুফায়দাহ পন্নী। এছাড়াও সম্মেলনে খুলনা বিভাগীয় সভাপতি তানভীর আহমেদ ও আঞ্চলিক সভাপতি জসেব উদ্দিনসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন শামসুজ্জামান মিলন।
অনুষ্ঠানটি চুয়াডাঙ্গার হাজার হাজার নারী-পুরুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এক বিশাল সমাবেশে পরিণত হয়।