Date: April 21, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / বিশেষ নিবন্ধ / ‘অনুসরণ করো তাদের যারা বিনিময় প্রত্যাশা করে না’ - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

‘অনুসরণ করো তাদের যারা বিনিময় প্রত্যাশা করে না’

June 10, 2025 07:32:11 PM   অনলাইন ডেস্ক
‘অনুসরণ করো তাদের যারা বিনিময় প্রত্যাশা করে না’

রাকীব আল হাসান:
পবিত্র কোর’আনের একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, “অনুসরণ করো তাদের যারা তোমাদের কাছে বিনিময় প্রত্যাশা করে না এবং হেদায়াতে আছে।” [সুরা ইয়াসিন: ২১]

কোর’আনের এই আয়াতটিকে আমাদের গভীরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। এখানে আল্লাহ হেদায়াহ বা সঠিক পথ সিরাতুল মুস্তাকিমে থাকার একটি অনন্য প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন- বিনিময় না নেওয়ার বিষয়টিকে। এই বিনিময় কোন বিনিময়? সাধারণত প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিনিময় প্রথা প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে স্বর্ণমুদ্রা, বর্তমানে টাকা। অর্থাৎ আল্লাহ বলেছেন যারা ধর্মের কাজ করে বিনিময় গ্রহণ করে বা অর্থ গ্রহণ করে বা প্রত্যাশা করে তাদের অনুসরণ করা যাবে না। এরা স্পষ্টতই দালালাতে আছে। যারা নিজেরাই দালালাতে থাকে তারা কীভাবে মানুষকে হেদায়াতের পথে উঠাবে?

আমাদের সমাজে একটি শ্রেণি দেখা যায়- যারা পেশাগত ধর্মজীবী, ধর্মের কাজ করেই যারা জীবিকা নির্বাহ করে। এটা শুনতে খুব খারাপ শোনালেও শত শত বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছে। তারা সাধারণত মসজিদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ইমামতি করায়, মুয়াজ্জিন, ওয়াজ-মাহফিলের বক্তা, দোয়া, কুলখানি, জানাজা, বিয়ে পড়ানো ইত্যাদি কাজ করে সংসার চালায়। প্রশ্ন করতে পারেন- শিক্ষকতা যদি পেশা হয়, রিকশা চালানো যদি পেশা হয়, সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অফিসে চাকুরী যদি বৈধ পেশা হয় তাহলে দীনের কল্যাণের জন্য নিয়মিত নামাজ পড়ানো, আজান দেওয়া, ওয়াজ মাহফিলে বক্তব্য দেওয়া এসব দোষ কীসের? এগুলো দোষের নয় কল্যাণকর কিন্তু এই কাজ যদি হয় অর্থের বিনিময়ে তাহলে সেটা ধর্মব্যবসা। কারণ, যে সমাজে অর্থের বিনিময়ে ধর্মের কাজ সম্পন্ন হয়, সে সমাজে অর্থ না দিলে ধর্মের কাজও থেমে থাকবে। যিনি আল্লাহর ঘোষণা প্রচার করবেন তিনি যদি অর্থের কাছে সীমাবদ্ধ হয়ে যান তাহলে সমাজের অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ করতে পারবেন না, সুদখোর মসজিদ কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে সুদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা যাবে না, চাঁদাবাজি নেতার বিরুদ্ধে কণ্ঠ মজবুত করা যাবে না। সুতরাং অর্থের কাছে ধর্ম তখন অসহায় হয়ে পড়বে। এজন্য ইসলামের কাজ করে বিনিময় গ্রহণ হারাম। এই হারাম আল্লাহ করেছেন। কোনো নবী-রসুল (সা.) দীনের শিক্ষা প্রচারের বিনিময় গ্রহণ করেননি। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো জাগতিক পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। আমাদের প্রিয় নবীও (সা.) ব্যবসায়ী ছিলেন কিন্তু ধর্মব্যবসায়ী ছিলেন না।

হ্যাঁ, ধর্মব্যবসায়ী। আমাদের সমাজে এই শ্রেণিটি বর্তমানে ব্যাপক পরিমাণে বেড়েছে। বিশেষত চুক্তিভিত্তিক ওয়াজ-মাহফিলে বক্তব্য দিয়ে শ্রোতাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা এখন তাদের নিয়মে পরিণত হয়েছে। অনেক জায়গায় অগ্রিম অর্থ প্রদান না করা হলে সেখানে বক্তা যান না। বক্তা আয়োজক কমিটির কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একটু আওয়াজ তুললেই তাকে স্টেজেই মারধর করা হয়, অপমানিত করা হয়। এটা একজন সম্মানিত আলেমের পরিণতি হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে তাদের আলেম বলা হলেও তারা ধর্মব্যবসায়ী আলেম। এদের কথাবার্তা অনেক সময় সাধারণ-সভ্য মানুষের ভাষা থেকেও জঘন্য হয়। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তাদের বক্তব্য নিয়ে মানুষ ট্রল করে, হাসি-তামাশা করে। এদের সম্পর্কেই আল্লাহ কোর’আনে আমাদেরকে সতর্কবার্তারূপে জানিয়ে দিয়েছেন, “তাদের মধ্যে একদল রয়েছে, যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে, যাতে তোমরা মনে কর যে, তারা কিতাব থেকেই পাঠ করছে। অথচ তারা যা তেলাওয়াত করছে তা আদৌ কিতাব নয়। এবং তারা বলে যে, এসব কথা আল্লাহর তরফ থেকে আগত। অথচ এসব আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত নয়। তারা বলে যে, এটি আল্লাহর কথা অথচ এসব আল্লাহর কথা নয়। আর তারা জেনে শুনে আল্লাহরই প্রতি মিথ্যারোপ করে।” [সুরা ইমরান ৭৮]

আমাদের সমাজের ধর্মজীবীরাও ঠিক এভাবেই ‘মুখ বাঁকিয়ে’ কেতাব পাঠ করেন, যেন সবাই বিশ্বাস করে যে তারা বুঝি আল্লাহ-রসুলের কথাই বলছেন। কিন্তু আদৌ তা নয়। তারা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী একটি ইসলামকে উপস্থাপন করছে যা তাদের পূর্বসূরীগণ বিকৃত করেছে সেগুলোকে অভিনব মুখভঙ্গি ও সুর সহযোগে আল্লাহর নামে চালিয়ে দিচ্ছে।

নবী-রসুলদের দায়িত্ব ছিল মানুষের সামনে ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা আলাদা করে দেওয়া। এরপর ন্যায়পথে যারা চলতে চায় তাদেরকে নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। স্বভাবতই সেই নবীর প্রতি ঈমান আনয়নের পর প্রতিটি মো’মেনের উপরও এই একই ঐশী দায়িত্ব অর্পিত হয়। সেই মো’মেনদের দায়িত্ব কী, তারা কেন শ্রেষ্ঠ জাতি সেটা আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,“তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। মানবজাতির মধ্য থেকে তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে এই জন্য যে তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দিবে, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর উপর ঈমান রাখবে।” [সুরা ইমরান ১১০]

কিন্তু যে সকল কথিত আলেম-ওলামারা ধর্মব্যবসা করেন তাদের পক্ষে এইভাবে সত্য ও মিথ্যাকে আলাদা করে দেওয়া এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব হয় কি? কস্মিনকালেও না। এর কারণ তারা একটি শ্রেণির কাছে আত্মবিক্রয় করেছেন। এটা চিরকাল হয়ে এসেছে যে, কোনো শাসক যখন অন্যায় করেন তখন সঙ্গে সঙ্গে সেই অন্যায়ের সমর্থনে বা নিজ দায়মুক্তির জন্য আইনও তৈরি করেন। সেই আইন তৈরি করে দেন আইন পরিষদের সদস্যরা, এর পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন বুদ্ধিজীবীরা। পূর্বকালে যখন ধর্মের আইন দিয়ে রাষ্ট্র চলত তখন শাসকের অন্যায়কে সমর্থন যোগাতে ধর্মের বিধানের মধ্যেও যোগ-বিয়োগ করা হয়েছে। সেটা করেছেন তখনকার ধর্মবেত্তাগণ তথা আলেমগণ। তাদের তৈরি করা শরিয়তকেই স্রষ্টার বিধান বলে কার্যকর করা হয়েছে। আজকে আমরা ইসলামের যে রূপটি দেখি সেটার খুব সামান্যই স্রষ্টার নাজিল করা। বাকিটা ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রণীত। সুলতান, বাদশাহদের পাপ কাজকে কোর’আন সুন্নাহর মাপকাঠিতে বৈধতা দিতে তারা ভাড়াটিয়া আলেমদের ব্যবহার করেছেন যারা পদ ও সম্পদের লোভে জনগণকে ইসলাম সম্পর্কে ভুল শিখিয়েছে। আজও এই শ্রেণিটি আমাদের সমাজে রয়েছে যারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের প্রয়োজনমাফিক ফতোয়া ও ব্যাখ্যা প্রদান করতে অত্যন্ত পটু।

ধর্মব্যবসার একটি অতি প্রচলিত রূপ হচ্ছে মসজিদগুলোতে নামাজের ইমামতির চাকরি করা। বর্তমানে এটাই সর্বজনবিদিত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে যে, সমাজে যারা বিত্তবান, প্রভাবশালী (যাদের বিরাট একটি সংখ্যা দুর্নীতিগ্রস্ত) তাদেরকে মসজিদ কমিটির পরিচালক বা সদস্য করা হয়। তাদের আয়ের উৎস কী সেটা নিয়ে কেউ আর প্রশ্ন তোলে না, তাদের অর্থ আছে, প্রভাব আছে এটাই যোগ্যতার মানদণ্ড। এর উদ্দেশ্য যে প্রধানত অর্থনৈতিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মসজিদের ইমামগণ এই কমিটির অধীনে চাকরি করেন। তাদের চৌহদ্দি মসজিদের চার দেয়াল। কেউ মারা গেলে, দোকান উদ্বোধন, মুসলমানি, বিয়ে পড়ানোর জন্য, গরু বকরি জবাই করতে তাদের ডাক পড়ে। জীবনের বাস্তব অঙ্গনে তাদের কোনো অংশগ্রহণের সুযোগই নেই।

বর্তমানের ইমামতি:
খ্রিষ্টানদের প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থা ও জীবনব্যবস্থার ফলে আমাদের সমাজেও দুই ধরনের নেতা সৃষ্টি হয়েছে - ধর্মীয় নেতা এবং অধর্মীয় নেতা। আজ মসজিদে যে নামাজ হয় তাতে অর্ধশিক্ষিত কয়েক হাজার টাকার বেতনভোগী ‘ধর্মীয়’ ইমাম সাহেবের পেছনে তার তাকবিরের (আদেশের) শব্দে ওঠ-বস করেন সমাজের ‘অধর্মীয়’ অর্থাৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা। নামাজ শেষ হলেই ঐ ‘অধর্মীয় নেতারা’ আর ‘ধর্মীয় নেতা’র দিকে চেয়েও দেখেন না। কারণ তারা জানেন যে ঐ ‘ধর্মীয়’ নেতার দাম কয়েক হাজার টাকা বেতনের বেশি কিছুই নয়, জাতীয় জীবনে তার কোনো দাম নেই, প্রভাব-কর্তৃত্ব নেই। ঐ ‘ধর্মীয় নেতারা’ অর্থাৎ ইমামরা যদি ‘অধর্মীয় নেতাদের’ সামনে কোনো ধৃষ্টতা-বেয়াদবি করেন বা কোনো একটি আদেশের অবাধ্যতা করেন তবে তখনই তাদের নেতৃত্ব অর্থাৎ মসজিদের ইমামতির কাজ শেষ। পশ্চিমা খ্রিষ্টান প্রভুদের অন্ধ অনুকরণ ও আনুগত্য করতে করতে এ জাতি এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে, ঐ খ্রিষ্টানদের পাদ্রীদেরও তাদের জাতির উপর যেটুকু সম্মান ও প্রভাব আছে, এই ‘ইমাম’ সাহেবদের তাও নেই। কমিটির লোকেরা যত বড় অন্যায়ই করুক, সুদখোর হোক, মাদকব্যবসা করুক, ঘুষখোর হোক, ধান্ধাবাজির রাজনীতি করুক সেগুলোর শক্ত প্রতিবাদ ইমাম সাহেবরা করতে পারেন না।

এ তো গেল ব্যক্তিস্বার্থে ধর্ম বিক্রি। এভাবে বহুরকম স্বার্থে যখন ন্যায়ের কণ্ঠস্বর মৌন হয়ে যায়, তখন ‘ধর্ম’ পরাজিত হয়ে যায়। আর ধর্মের মিম্বরে দাঁড়িয়ে যখন অধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা হয় না, তখন সমাজ থেকে ধর্ম বিদায় নিতে সময় লাগে না। যখন অন্যায়ের প্রতিবাদ অর্থাৎ আদর্শিক লড়াই করার হিম্মত, সাহস ও যোগ্যতা জাতির মধ্যে থেকে লুপ্ত হয়ে গেল, তখন ভারসাম্যহীন সুফিবাদীরা বিকল্প হিসাবে নফসের বিরুদ্ধে জেহাদকে আবিষ্কার করলেন। আজকে জেহাদে আকবর বলতেই বোঝানো হয় নফসের বিরুদ্ধে জেহাদ। এ জেহাদের আবিষ্কর্তারা তাদের বক্তব্যের সমর্থনে মাত্র তিনটি হাদিসের উল্লেখ করতে পেরেছেন। এগুলোর একটি বর্ণনা করেছেন ইবনে নাজ্জার, একটি দায়লামি ও তৃতীয়টি খতিব। সমস্ত মুহাদ্দিসগণ এক বাক্যে ঐ তিনটি হাদিসকে দুর্বল অর্থাৎ দয়ীফ বলে রায় দিয়েছেন। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানীর মতো বিখ্যাত মুহাদ্দীস ঐ হাদিসগুলোক হাদিস বলেই স্বীকার করেন নি। বলেছেন নফসের সঙ্গে যুদ্ধ জেহাদে আকবর, এটা হাদিসই নয়। এটি একটি আরবি প্রবাদবাক্য মাত্র [তাশদীদ উল কাভেস- হাফেজ ইবনে হাজার]। গত কয়েক শতাব্দী ধরে আল্লাহর ঘোষণার বিপরীত এই ‘জেহাদে আকবর’ চালু করার ফল এই হয়েছে যে, সমগ্র জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সংগ্রামের চরিত্র হারিয়ে নির্জীব, নিবীর্য্য, নিষ্প্রাণ হয়েছে। সেজন্য তাদের আবিষ্কৃত আত্মার বিরুদ্ধে জেহাদও দুনিয়া জোড়া তাদের মার খাওয়া ঠেকাতে পারল না, গোলাম হওয়া ঠেকাতে পারল না এমন কি চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে সৃষ্ট সামাজিক অপরাধও দূর করতে পারল না।

[যোগাযোগ: ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৬২১৪৩৪২১৩, ০১৭৮৩৫৯৮২২২]