


পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করা হলেও বাস্তবে দেশের অসংখ্য নারী সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছেন নিজের ঘরেই। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে স্বামী, স্বামীর পরিবার ও নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৫৬৫ নারী। এর মধ্যে শুধু স্বামীর হাতেই খুন হয়েছেন ১ হাজার ৩৪ জন নারী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতার অধিকাংশ ঘটনা দীর্ঘদিনের নির্যাতনের ফল, যা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতিতে পৌঁছায়।
সম্প্রতি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনা আবারও সামনে এনেছে এই বাস্তবতা। গত ৮ মে দিবাগত রাতে স্বামী ফোরকান মোল্লার হাতে খুন হন গৃহবধূ শারমিন আক্তার। একই ঘটনায় নিহত হয় তার তিন সন্তান ও এক ভাই। স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে এবং দীর্ঘদিনের নির্যাতনের শিকার হলেও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সংসার টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সংসারই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার কয়েক মাস আগেও স্বামীর মারধরে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন শারমিন। এরপরও সংসার ছাড়তে চাননি তিনি। ঘটনার পর পলাতক ফোরকান মোল্লার মরদেহ পরে মুন্সিগঞ্জের পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হয়, পালানোর সময় তিনি পদ্মা সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৫৬৫ নারী। এর মধ্যে স্বামীর হাতে ১ হাজার ৩৪ জন, স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে ২৭৩ জন এবং নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে ২৫৮ জন নারী নিহত হয়েছেন। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এটি কেবল নথিভুক্ত ঘটনার হিসাব; বাস্তবে সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
চলতি বছরের প্রথম চার মাসেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। এই সময়ের মধ্যে স্বামীর হাতে নিহত হয়েছেন ৫৬ নারী। একই সময়ে নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে ২১ জন এবং স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন আরও আটজন নারী। অর্থাৎ মাত্র চার মাসেই পারিবারিক সহিংসতায় প্রাণ গেছে ৭৯ নারীর।
নারী অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যে উঠে এসেছে, স্ত্রী হত্যার পেছনে সবচেয়ে বেশি কাজ করে যৌতুকের চাপ, পারিবারিক কলহ, পরকীয়ার সন্দেহ, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মানসিকতা এবং নারীর স্বাধীন চলাফেরার ওপর বাধা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজে নারীদের এখনও অনেক ক্ষেত্রে অধীনস্থ ও দুর্বল হিসেবে দেখা হয়, যা সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাগুলো হঠাৎ ঘটে না। অধিকাংশ নারী দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু সামাজিক চাপ, পরিবারের সম্মান, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং আর্থিক নির্ভরতার কারণে অনেক নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন না। একসময় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ, ২০২৪’ অনুযায়ী, প্রতি চারজন নারীর মধ্যে তিনজন জীবনে অন্তত একবার স্বামী বা জীবনসঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক নির্যাতন, মানসিক চাপ, যৌন সহিংসতা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তিনজনের মধ্যে দুজন নারী কখনোই এসব নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেন না।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, নারীপক্ষ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টসহ বিভিন্ন সংগঠন বলছে, শুধু আইন করলেই হবে না, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। তাদের মতে, সহিংসতা সহ্য করাকে পারিবারিক মূল্যবোধ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন হবে।
ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, স্বামীর মারধর বা মানসিক নির্যাতনকে এখনও অনেক পরিবার স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেয়। সামাজিক লজ্জা ও আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে নারীরা অনেক সময় নির্যাতনের কথা গোপন রাখেন। এতে সহিংসতা ধীরে ধীরে আরও ভয়ংকর রূপ নেয়।
অন্যদিকে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, দাম্পত্যে অবিশ্বাস এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও পারিবারিক সহিংসতা বাড়ার অন্যতম কারণ। মানসিক চাপ ও রাগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা অনেক সময় পরিবারে দুর্বল সদস্যদের ওপর সহিংস আচরণে রূপ নেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ মনে করেন, পরিবারে পারস্পরিক যোগাযোগ কমে যাওয়াও একটি বড় কারণ। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক ও বোঝাপড়া কমে যাচ্ছে। ফলে ছোট বিরোধও দ্রুত বড় সংঘাতে পরিণত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইনি পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, দ্রুত বিচার, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি এবং নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার কার্যকর উদ্যোগ।