


দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় বাংলাদেশকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংক্রমণ ৬৪ জেলার মধ্যে প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, টিকাদানে ঘাটতি এবং শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই দেশে হামের সংক্রমণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র এক মাসে ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ২ হাজার ৯৭৩ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১২ হাজার ৩১৮ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। দেশের প্রায় ৯১ শতাংশ জেলা এখন হামের সংক্রমণে আক্রান্ত, যা জাতীয় পর্যায়ের বিস্তৃত প্রাদুর্ভাবের ইঙ্গিত দেয়।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, আটটি বিভাগেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, তবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগ। শুধু ঢাকা বিভাগেই ৮ হাজার ২৬৩ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। বিশেষ করে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলসহ ঘনবসতিপূর্ণ ও বস্তি এলাকাগুলোতে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি।
অন্যান্য বিভাগেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রাজশাহী বিভাগে ৩ হাজার ৭৪৭ জন, চট্টগ্রামে ২ হাজার ৫১৪ জন এবং খুলনা বিভাগে ১ হাজার ৫৬৮ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। আক্রান্তদের মধ্যে ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী, যার মধ্যে ৬৬ শতাংশ দুই বছরের নিচে এবং ৩৩ শতাংশ মাত্র ৯ মাসের কম বয়সী শিশু। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বয়সী শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম থাকায় তারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃত শিশুদের অধিকাংশই টিকা না পাওয়া অথবা আংশিক টিকা পাওয়া ছিল। এছাড়া আক্রান্তদের ৯১ শতাংশই ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী, যা শিশুদের মধ্যে টিকাদান ঘাটতির একটি গুরুতর চিত্র তুলে ধরে।
ডব্লিউএইচও আরও জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ সালে দেশে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকাদানে বড় ধরনের ঘাটতি এই পরিস্থিতির প্রধান কারণগুলোর একটি। ২০০০ সালে যেখানে টিকা কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ২০২০ সালের পর থেকে নিয়মিত জাতীয় সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি (এসআইএ) না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
প্রতিবেদনে অপুষ্টি এবং ভিটামিন এ-এর ঘাটতিকে অতিরিক্ত ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কারণে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) মতো জটিলতা বেড়ে যাচ্ছে, যা মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।