


পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচন রাজ্য রাজনীতিতে বড় ধরনের পালাবদলের ইঙ্গিত দিয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস এবার বড় ধাক্কা খেয়েছে। শুধু দলগতভাবে পিছিয়ে পড়াই নয়, দলটির একাধিক ‘হেভিওয়েট’ নেতা, মন্ত্রী এবং তারকা প্রার্থীও পরাজিত হয়েছেন। এমনকি বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও হেরে গেছেন, যা এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সবচেয়ে আলোচিত লড়াইটি হয় নন্দীগ্রামে, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখোমুখি হন তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, বর্তমানে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী-এর। কঠিন এই লড়াইয়ে প্রায় ১৫ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত হন মমতা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল রাজ্যের ভোটের মনোভাবের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা পরাজয়ের মুখ দেখেছেন। বিধাননগরে সুজিত বসু প্রায় ৩৭ হাজার ভোটে হেরেছেন বিজেপির শারদ্বত মুখোপাধ্যায়-এর কাছে। দমদম উত্তর কেন্দ্রে মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য পরাজিত হয়েছেন সৌরভ সিকদার-এর কাছে ২৬ হাজারের বেশি ভোটে।
তারকা প্রার্থী হিসেবেও তৃণমূল খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। অভিনেত্রী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাহনগরে প্রায় ১৭ হাজার ভোটে হেরেছেন সজল ঘোষ-এর কাছে। ব্যারাকপুরে চলচ্চিত্র পরিচালক রাজ চক্রবর্তী-ও ১৫ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছেন কৌস্তুভ বাগচী-এর কাছে।
রাসবিহারীতে দেবাশিস কুমার প্রায় ২১ হাজার ভোটে হেরেছেন বিজেপির স্বপন দাশগুপ্ত-এর কাছে। টালিগঞ্জে তৃণমূলের শক্তিশালী নেতা অরূপ বিশ্বাস ৬ হাজারের বেশি ভোটে হেরেছেন পাপিয়া দে অধিকারী-এর কাছে।
শ্যামপুকুরে মন্ত্রী শশী পাঁজা ১৪ হাজারের বেশি ভোটে হেরেছেন পূর্ণিমা চক্রবর্তী-এর কাছে। বেহালা পশ্চিমে রত্না চট্টোপাধ্যায় ২৪ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছেন ইন্দ্রনীল খাঁ-এর কাছে।
কাশীপুর-বেলগাছিয়ায় অতীন ঘোষ অল্প ব্যবধানে (১,৬৫১ ভোট) হেরেছেন রিতেশ তিওয়ারি-এর কাছে। মানিকতলায় শ্রেয়া পাণ্ডে ১৫ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছেন তাপস রায়-এর কাছে।
দমদমে ব্রাত্য বসু ২৫ হাজারের বেশি ভোটে হেরেছেন অরিজিৎ বক্সী-এর কাছে। কোচবিহারের মেখলিগঞ্জে পরেশচন্দ্র অধিকারী প্রায় ৩০ হাজার ভোটে হেরেছেন দধিরাম রায়-এর কাছে।
দিনহাটায় তিনবারের বিধায়ক উদয়ন গুহ ১৭ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছেন অজয় রায়-এর কাছে। রাজগঞ্জে সাবেক অ্যাথলেট স্বপ্না বর্মণ ২১ হাজারের বেশি ভোটে হেরেছেন দীনেশ সরকার-এর কাছে।
শিলিগুড়িতে গৌতম দেব বড় ব্যবধানে (৭৩ হাজার ভোটের বেশি) পরাজিত হয়েছেন শঙ্কর ঘোষ-এর কাছে। দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটে অর্পিতা ঘোষ প্রায় ৪৮ হাজার ভোটে হেরেছেন বিদ্যুৎকুমার রায়-এর কাছে।
এবারের নির্বাচনে মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯৩টির ফলাফলে বিজেপি প্রায় ২০৬টিতে জয়ী বা এগিয়ে রয়েছে, যা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ৮০-এর আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যাচ্ছে।
২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় পর এবার সেই রাজ্যেই রাজনৈতিক পালাবদলের আভাস স্পষ্ট। বিশ্লেষকদের মতে, এই ফল শুধু সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।