


গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ শীর্ষক এক বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এক বাস্তবতা। তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় থাকা বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের নাম। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে তালিকাভুক্ত দেশগুলো হলো- আফগানিস্তান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআর কঙ্গো), মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া এবং ইয়েমেন।
প্রতিবেদনটি স্পষ্টভাবে বলছে- বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের প্রধান কারণ যুদ্ধ ও সংঘাত। তালিকার দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রায় প্রতিটি দেশই সরাসরি যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে।
সংক্ষেপে দেশগুলোর বাস্তবতা: নাইজেরিয়ায় সশস্ত্র বিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। আফগানিস্তান বছরের পর বছর যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ। ডিআর কঙ্গোতে গৃহযুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাত অব্যাহত, এম-২৩ বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘর্ষে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত। পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, সীমান্ত সংঘাত এবং নিরাপত্তা সংকটে জর্জরিত। মিয়ানমারে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। সুদান বর্তমানে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে নিমজ্জিত। সদ্য স্বাধীন হওয়া দক্ষিণ সুদান স্বাধীনতার পর থেকেই অস্থিতিশীল। সিরিয়ায় এক দশকের বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধের ক্ষত এখনো শুকায়নি। ইয়েমেন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বিপর্যস্ত, যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করলাম, কেবল কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআর কঙ্গো) ও মিয়ানমার ব্যতীত তালিকার ১০টি দেশের ৮টি দেশই মুসলিমপ্রধান দেশ।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেলাম বিশ্বের অন্যতম আলোচিত মানবিক সংকটের কেন্দ্র ফিলিস্তিনের নাম এই তালিকায় না দেখে। তালিকায় ফিলিস্তিনের নাম না দেখে। ফিলিস্তিন কি তাহলে রিকভার করে ফেলল নাকি? ইরানের সাথে চলা যুদ্ধের মধ্যে গাজা কি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেল? পরক্ষণেই বুঝলাম যে বিষয় তা নয়। ফিলিস্তিনকে তো রাষ্ট্রই মনে করা হয় না। মুছে ফেলা হয়েছে। আছে কিন্তু মূলত থাকা প্রয়োজন নয়!
বড় প্রশ্নটা হলো- এই তালিকায় বাংলাদেশ কেন? বাংলাদেশ তো এসব দেশের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত নয়। তাহলে কি দুর্ভিক্ষের পথে আগাচ্ছে দেশ?
দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালে। স্বাধীনতার পর দেশ কোনো দেশের সাথে যুদ্ধে জড়ায়নি। গৃহযুদ্ধও হয়নি। তাহলে কেন একই কাতারে বাংলাদেশ? এর কারণ কি? এর থেকে উত্তরণের পথ কি? মোটা দাগে এসব প্রশ্ন উঠবে।
অনেকে হয়ত বলতে পারেন যে, সদ্য একটি গণঅভ্যূত্থান হলো! অনেক ধকল গেছে দেশের উপর দিয়ে। এই কারণে এমন সঙ্কটে পতিত হয়েছে দেশ। কিন্তু অভ্যূত্থানের পর তো দেশের হাল ধরেছিলেন ভূবনবিখ্যাত একজন নোবেল লরিয়েট। তিনিও কেন পারলেন না? বরং তার আমলে অবস্থা আরো নাজুক হয়েছে। সমস্যাটা আসলে কোথায়?
তাছাড়া অভ্যূত্থান তো শ্রীলঙ্কায়ও হয়েছে। নেপালেও হয়েছে। নেপাল-শ্রীলঙ্কার নাম তো তালিকায় নেই। তারা সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারলেও বাংলাদেশ কেন পারল না। ওসব দেশে তো ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর মত নোবেল লরিয়েটও নেই। এমনকি অন্য ৯টি দেশেও ড. ইউনূস এর মতো ব্যক্তিত্ব নেই।
আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের দুর্নীতি, লুটপাটের প্রভাব অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে পড়েছে এটা যেমন সত্য সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা বা গণআন্দোলন অর্থনীতিকে কিছুটা হলেও ধাক্কা দিয়েছে সেটাও অনস্বীকার্য। কিন্তু তা বলে এমন দুরবস্থা হবার কথা নয়।
অনেকে অবশ্য কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে বড় কারণ বলে মনে করছেন। বিশেষ করে সার ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়া কৃষিখাতে বিনিয়োগও কমছে। কৃষকদের ঋণে সুদের হারা বৃদ্ধিও আরেকটি কারণ। এসব কারণে উৎপাদন কমছে। পক্ষান্তরে আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে।
যদি তাই হয়ে থাকে- আমেরিকার সাথে হওয়া নতুন বাণিজ্য চুক্তি এই সঙ্কটকে আরো গভীর করবে। এই চুক্তি দেশকে যেভাবে আমদানি-নির্ভরতার ফাঁদে আটকে ফেলবে সেখান থেকে বের হওয়া সহজ হবে না। আমেরিকা থেকে প্রতিবছর ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য কিনতে হবে বাংলাদেশকে। যার প্রভাব একজন সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে শিল্পপতিদের গায়েও লাগবে।
কথা হচ্ছে- বাংলাদেশ এখনো সেই অবস্থায় যায়নি, যেখান থেকে ফেরার পথ নেই। বরং এটি একটি সতর্কবার্তা। এখনও আমেরিকার সাথে করা ড. ইউনূসের চুক্তি বাতিল কিংবা রদবদলের সুযোগ রয়েছে। সরকারের উচিত বিষয়টি বিবেচনা করে একটি সিদ্ধান্তে আসা।