


গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে নৌ অবরোধ, জাহাজ জব্দ ও সামরিক তৎপরতা ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ জারি রেখেছে এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে ইসরায়েল উসকানিমূলক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষায়, এসব কর্মকাণ্ড যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এর মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ‘জিম্মি’ করে রাখা হচ্ছে।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, তেহরান আলোচনায় আগ্রহী থাকলেও বাস্তবে অঙ্গীকার ভঙ্গ, অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক হুমকি—এই তিনটি বিষয়ই অর্থবহ সংলাপের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আলোচনার অগ্রগতি সম্ভব নয়।
কূটনৈতিক অঙ্গনে এর আগে ধারণা করা হচ্ছিল, পাকিস্তান-এ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন দফা শান্তি আলোচনা শুরু হতে পারে। তবে এখনো সে আলোচনা শুরু হয়নি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ইরানের ওপর চলমান নৌ অবরোধে সন্তুষ্ট ট্রাম্প প্রশাসন। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং যুদ্ধের সমাপ্তি কবে হবে, সেটি অনেকটাই ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক তৎপরতাও বেড়েছে। ইরান জানিয়েছে, ‘পরিদর্শনের’ উদ্দেশ্যে তারা দুটি কার্গো জাহাজ জব্দ করেছে। এর আগে একই এলাকায় তিনটি জাহাজে হামলার ঘটনাও সামনে আসে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনী দাবি করেছে, জব্দ করা জাহাজগুলো অনুমতি ছাড়া চলাচল করছিল এবং নেভিগেশন নিয়ম ভঙ্গ করছিল। এমনকি গোপনে প্রণালি ত্যাগের চেষ্টা ও নেভিগেশন সিস্টেমে কারসাজির অভিযোগও আনা হয়েছে। এসব ‘লঙ্ঘনকারীদের’ বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে একটি গ্রিক মালিকানাধীন জাহাজে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গ্রিস-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যদিও সেটি ইরান জব্দ করেছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, দেশটির নৌবাহিনীর সচিব জন ফেলান তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব ছাড়ছেন। তবে এ সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ স্পষ্ট করা হয়নি, যা নতুন করে জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখন কৌশলগত শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে ইরান এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বজায় রেখে তেহরানকে চাপে রাখতে চাইছে। ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও উত্তেজনা কমার কোনো ইঙ্গিত এখনো মিলছে না।
সূত্র: বিবিসি