Date: May 01, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / আন্তর্জাতিক / যুদ্ধের প্রভাবে ঝুঁকিতে এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তা - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

যুদ্ধের প্রভাবে ঝুঁকিতে এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তা

May 01, 2026 06:09:51 PM   আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুদ্ধের প্রভাবে ঝুঁকিতে এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তা

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নে এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সার সংকট, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে থাইল্যান্ড থেকে ভিয়েতনাম পর্যন্ত কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট দীর্ঘ হলে ধান উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এখন ধান রোপণের মৌসুম চলছে। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। থাইল্যান্ডের চাচোয়েংসাও প্রদেশের কৃষক সুচার্ট পিয়ামসোমবুন জানান, আগে যে সার ৮০০ থেকে ৯০০ বাত দামে পাওয়া যেত, তা এখন ১১০০ থেকে ১২০০ বাত পর্যন্ত পৌঁছেছে। অনেক ক্ষেত্রে সার পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। ফলে তিনি এ মৌসুমে চাষাবাদ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এই সংকট শুধু থাইল্যান্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। ভিয়েতনামের মেকং ডেল্টা থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত কৃষকেরা একই সমস্যায় পড়েছেন। বীজ বপনের সময় চলে এলেও সারের অভাবে অনেকেই জমি পতিত রাখার কথা ভাবছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতির মূল কারণ হলো সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সারের বাণিজ্য পরিচালিত হয়। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ইউরিয়া সারের দাম ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেছে।

অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সার উৎপাদনকারী দেশ চীন নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে সারের রপ্তানি সীমিত করেছে। ২০২৩ সালে প্রণীত খাদ্য নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী দেশটি কৃষি উৎপাদনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালির সংকট এবং চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব বৈশ্বিক খাদ্য বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর গবেষক জোসেফ গ্লবার সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। ভিয়েতনাম, যা বিশ্বের অন্যতম বড় চাল রপ্তানিকারক, তার সারের বড় অংশই চীন থেকে আমদানি করে। একইভাবে ফিলিপাইন তাদের প্রায় ৭৫ শতাংশ সার চীন থেকে আনে এবং চালের জন্য ভিয়েতনামের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি দেশের সংকট অন্য দেশের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। দেশটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার চীন ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে। এই দুই উৎসই বর্তমানে অনিশ্চয়তায় রয়েছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে বড় প্রভাব দেখা না গেলেও বছরের শেষ দিকে উৎপাদন কমে গেলে এর প্রভাব স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে, চলমান বৈশ্বিক সংকট অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে আরও প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে। বিশেষ করে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

যুদ্ধের প্রভাব শুধু সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকছে না—তা সরাসরি কৃষি, খাদ্য উৎপাদন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এই সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।