


বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশের আজ ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় এক মর্মান্তিক ট্রাম দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবির জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে। তাঁর পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন শিক্ষক ও সমাজসেবক, আর মা কুসুমকুমারী দাশ নিজেও ছিলেন একজন কবি। যদিও জন্ম বরিশালে, তাদের আদি নিবাস ছিল বিক্রমপুরের গাওপাড়া গ্রামে।
জীবনানন্দ দাশের কর্মজীবনের শুরু ও শেষ — দুটোই শিক্ষকতার মাধ্যমে। ১৯২২ সালে কলকাতার ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত সিটি কলেজে টিউটর হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯২৮ সালে সরস্বতী পূজা নিয়ে কলেজে গোলযোগের পর অন্য কয়েকজনের সঙ্গে তাকেও ছাঁটাই করা হয়। জীবনের শেষভাগে তিনি কলকাতার ‘স্বরাজ’ দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য বিভাগের সম্পাদনা করেন। চাকরি জীবনে নানা অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। জীবিকার তাগিদে কখনো ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির এজেন্ট, কখনো গৃহশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। স্ত্রী লাবণ্য দাশ স্কুলশিক্ষিকা ছিলেন; তাঁর আয়েই অনেকটা সংসার চলত। মৃত্যুর সময় তিনি হাওড়া গার্লস কলেজে অধ্যাপনা করছিলেন।
দারিদ্র্য ও বাস্তব জীবনের সংগ্রাম জীবনানন্দের কবিতায় এক গভীর নিঃসঙ্গতার সুর এনে দিয়েছে। তাঁর কাব্যজীবন শুরু ‘ঝরাপালক’ (১৯২৭) দিয়ে, যা আধুনিক বাংলা কবিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ (১৯৩৬), ‘বনলতা সেন’ (১৯৪২), ‘মহাপৃথিবী’ (১৯৪৪), ‘সাতটি তারার তিমির’ (১৯৪৮), ‘রূপসী বাংলা’ (১৯৫৭) এবং ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ (১৯৬১)। প্রতিটি কাব্যগ্রন্থই তাঁর ভাষা, প্রকৃতি ও একাকীত্ববোধের অনন্য প্রকাশ।
কবিতার পাশাপাশি তিনি বেশ কয়েকটি উপন্যাসও রচনা করেছিলেন, যেগুলোর বেশিরভাগই মৃত্যুর আগে প্রকাশিত হয়নি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ‘পূর্ণিমা’ (১৯৩১), ‘করুবাসনা’ (১৯৩৩), ‘নিরুপম যাত্রা’ (১৯৩৩), ‘জীবনপ্রণালী’ (১৯৩৩), ‘জলপাইহাটি’ (১৯৪৮) এবং ‘বাসমতীর উপাখ্যান’ (১৯৪৮)। তাঁর একমাত্র প্রবন্ধগ্রন্থ ‘কবিতার কথা’ (১৯৫৬)।
জীবনানন্দ দাশ জীবদ্দশায় তেমন স্বীকৃতি পাননি, কিন্তু মৃত্যুর পর বাংলা কবিতার ধারায় তিনি হয়ে উঠেছেন এক অনন্য উচ্চতার প্রতীক। ১৯৫২ সালে নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলনের পরিবর্ধিত সিগনেট সংস্করণ ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা ১৩৫৯ সালের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে পুরস্কৃত হয়। আর ১৯৫৫ সালে ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থের জন্য তাঁকে মরণোত্তরভাবে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার প্রদান করা হয়।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হচ্ছে সেই কবিকে, যিনি নিঃসঙ্গতা, প্রকৃতি আর মানবজীবনের গভীর অন্তর্লোককে এমন মায়াবী ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন, যা বাংলা কবিতাকে দিয়েছে এক নতুন প্রাণ ও দর্শন।