Date: April 19, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / সারাদেশ / ঢাকা / মাওনা-কালিয়াকৈর সড়ক: প্রকৃতির নয়নাভিরাম রূপের বাঁকে বাঁকে মৃত্যুর হাতছানি - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্র...

মাওনা-কালিয়াকৈর সড়ক: প্রকৃতির নয়নাভিরাম রূপের বাঁকে বাঁকে মৃত্যুর হাতছানি

September 01, 2025 03:31:12 PM   উপজেলা প্রতিনিধি
মাওনা-কালিয়াকৈর সড়ক: প্রকৃতির নয়নাভিরাম রূপের বাঁকে বাঁকে মৃত্যুর হাতছানি

আব্দুল্লাহ তারেক রানা:
গাজীপুরের শাল-গজারি বনের সবুজে ঘেরা বুক চিরে চলে গেছে মাওনা-কালিয়াকৈর সড়ক। ৩২ কিলোমিটারের এই পথটুকু যেন প্রকৃতির এক অনবদ্য ক্যানভাস। প্রখর রোদে শীতল বাতাস আর ছায়াঘেরা পরিবেশ চালক ও যাত্রীদের দেয় প্রশান্তির অনুভূতি। যানজটমুক্ত হওয়ায় শিল্পাঞ্চল মাওনা ও কালিয়াকৈরের মধ্যে যোগাযোগের জন্য এটি এক আদর্শ পথ। কিন্তু এই মুগ্ধতার আড়ালেই ওঁত পেতে আছে ভয়ঙ্কর বিপদ। সড়কের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা নীরব ঘাতক কেড়ে নিচ্ছে একের পর এক তাজা প্রাণ, সৃষ্টি করছে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। যে পথ ছিল প্রশান্তির, তা-ই এখন পরিণত হয়েছে ‘মৃত্যু উপত্যকায়’।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসের পরিসংখ্যান এক ভয়াবহ ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোর তথ্যমতে, এই সময়ে সড়কের ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে অর্ধ শতাধিক দুর্ঘটনায় ঝরে গেছে ১১টি অমূল্য জীবন। আহত শতাধিক মানুষের মধ্যে অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন দুঃসহ স্মৃতি। অথচ এই রক্তাক্ত অধ্যায় থামাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা যেন কেবল কাগুজে আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

এই সড়কের প্রতিটি বাঁক যেন এক একটি স্বতন্ত্র মৃত্যুফাঁদ। চালকদের ভাষায়, বাঁকগুলো এতটাই আকস্মিক ও বিপজ্জনক যে এক পাশ থেকে অন্য পাশের কিছুই দেখা যায় না। বেশিরভাগ বাঁকেই নেই কোনো সতর্কতামূলক সংকেত বা দিকনির্দেশনা। যাও বা কিছু চিহ্ন রয়েছে, তা এতটাই অস্পষ্ট ও অযত্নে পড়ে আছে যে দূর থেকে বোঝার উপায় নেই। বিশেষ করে রাতের আঁধারে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে, যখন দ্রুতগতির যানবাহনের চালকরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্ঘটনার শিকার হন।

দুর্ঘটনার এই মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। গত ১৮ জুলাই বড়চালা এলাকায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজনসহ পাঁচজনের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। বগুড়া থেকে আসা জাহিদুল ইসলাম তার স্ত্রী নাসরিন ও শিশুসন্তান আবু হুরায়রাকে নিয়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সড়কের একটি বাঁক তাদের সব স্বপ্ন কেড়ে নেয়। এর আগে ১৪ জুন বদনীভাঙ্গা এলাকায় চলন্ত গাড়ির ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারান ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদ ও তার সঙ্গী জাকির হোসেন। একইভাবে ১৯ জুলাই ঔষধ ব্যবসায়ী রোদ্র পাল, ১৫ আগস্ট গৌরাঙ্গ চন্দ্র মন্ডল এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি রাশেদ ও আবু বক্কর ছিদ্দিক নামের দুই ব্যক্তি এই সড়কের নির্মমতার শিকার হন। প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা যেন এই সড়কের দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়েছে।

সিএনজিচালক মোশাররফ হোসেনের কথায় ফুটে ওঠে চালকদের অসহায়ত্ব, "এই রাস্তায় গাড়ি ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলে। বাঁকের কাছে এসে হঠাৎ গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। একটা উত্তল আয়না (কনভেক্স মিরর) লাগিয়ে দিলেই তো অপর পাশের গাড়িটা দেখা যেত, কিন্তু কে শোনে কার কথা!" আরেক চালক শাহজালালের মতে, কার্যকর সংকেত বাতি এবং বাঁকগুলোতে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে এই মৃত্যুমিছিল থামানো যাবে না।

সড়কটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের গাজীপুর কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সোহেল মিয়া সমস্যার কথা স্বীকার করে জানান, বাঁকগুলোতে দ্রুতই দিকনির্দেশনামূলক চিহ্ন স্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, "আমরা সড়কের ঝুঁকি কমাতে স্পিড ব্রেকারের পরিবর্তে র‌্যাম্বল স্ট্রিপ (ঘন ছোট গতিরোধক) বসানোর কথা ভাবছি, যাতে গাড়ির গতি কমে আসে।”

তবে এসব আশ্বাসে আর আস্থা রাখতে পারছেন না স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা। তাদের প্রশ্ন, আর কত প্রাণ গেলে কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙবে? প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এই পথ আর কতদিন স্বজনহারাদের কান্নায় ভারী হয়ে থাকবে, তার উত্তর আজও অজানা।