


ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায় থাকলে যে কোনো বয়সেই সাফল্য পাওয়া সম্ভব- তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরের রুবেল চৌধুরী। ৫০ বছর বয়সে স্নাতক (ডিগ্রি) সম্পন্ন করে তিনি প্রমাণ করেছেন, স্বপ্ন পূরণে বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র।
বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর ইউনিয়নের খোদে হাড়িয়া গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে ১৯৭৪ সালের আগস্টে জন্ম নেন রুবেল চৌধুরী। শৈশব থেকেই পড়াশোনার প্রতি টান থাকলেও নিয়তি ছিল ভিন্ন। ১৯৮৭ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। সেই শোক আর সংসারের আকস্মিক চাপে অকালেই থমকে যায় তাঁর শিক্ষাজীবন। ১৯৯২ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী হওয়ার কথা থাকলেও নানা প্রতিকূলতায় পরীক্ষায় বসা সম্ভব হয়নি।
সংসারের চাকা ঘোরাতে ১৯৯৫ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ সময় প্রবাসে কাটান রুবেল। এক ছেলে ও তিন মেয়ের বাবা রুবেল চৌধুরী প্রবাসে থাকলেও অন্তরের গভীরে লালন করতেন অপূর্ণ শিক্ষাজীবনের স্বপ্ন। তাঁর বড় ছেলে ২০২০ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং ২০২৩ সালে তাঁর মেয়েও উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যান। সন্তানদের এই সাফল্যই তাঁর সুপ্ত বাসনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৮ সালে তিনি বেসরকারিভাবে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০২০ সালে সম্পন্ন করেন এইচএসসি। প্রবাসে থাকাকালীন প্রতি বছর ছুটিতে দেশে ফিরে তিনি পরীক্ষাগুলোতে অংশ নিতেন। শত ব্যস্ততা আর পারিবারিক দায়িত্বের মাঝেও তিনি লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। ২০২২ সালে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসার পর ২০২৬ সালে তিনি সফলভাবে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা নুরধন ভূঁইয়া বলেন, “প্রায় ৫০ বছর বয়সে পড়াশোনা করে ডিগ্রি অর্জন করা নিঃসন্দেহে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাঁর এই অর্জন আমাদের গ্রামের জন্য গর্বের।” স্থানীয় বাসিন্দা হারুনুর রশিদ মনে করেন, এমন সংগ্রামী মানুষের গল্প জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা উচিত, যা সমাজকে ইতিবাচকভাবে অনুপ্রাণিত করবে।
চম্পকনগর কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুস সাত্তার সরকার বলেন, “দীর্ঘ বিরতির পর পড়াশোনায় ফিরে এসে স্নাতক সম্পন্ন করা সহজ কাজ নয়। তাঁর এই সাফল্য প্রমাণ করে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই অজেয় নয়।”
বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাছিবুর রহমান রুবেল চৌধুরীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “রুবেল চৌধুরীর এই অর্জন প্রমাণ করে যে শিক্ষা গ্রহণের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। তাঁর এই সাফল্য তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে।”
ব্যক্তিগত সাফল্যের উর্ধ্বে রুবেল চৌধুরীর এই জয়যাত্রা আজ বিজয়নগর উপজেলার মানুষের কাছে অদম্য মানসিক শক্তির প্রতীক। তিনি আজ শুধু তাঁর পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর এই জীবনগাথা আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বপ্ন কখনো সময়ের কাছে হার মানে না।