


ছোট পর্দার আলোচিত শিশুশিল্পী সিমরিন লুবাবার বিয়ের খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয়েছে তুমুল আলোচনা ও বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে, মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন, যা বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বাল্যবিবাহের মধ্যে পড়ে। তবে বিষয়টি নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি লুবাবা বা তার পরিবার। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—আইন অনুযায়ী কী ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে পারেন তিনি ও তার স্বামী?
এক সময়ের জনপ্রিয় শিশুশিল্পী সিমরিন লুবাবা আগেই শোবিজ অঙ্গন থেকে নিজেকে সরিয়ে ধর্মীয় জীবনধারায় মনোযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তার একটি পোস্ট থেকেই বিয়ের ইঙ্গিত ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা।
নেটিজেনদের একাংশ দাবি করছেন, লুবাবার বয়স এখনো ১৮ বছরের নিচে। বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২১ সালে তিনি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন এবং ২০২৩ সালেও স্কুলে পড়াশোনা করছিলেন। সেই হিসাবে বয়সের হিসাব করলে তার বিয়ের আইনগত বয়স পূর্ণ হয়নি বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী, কন্যার ন্যূনতম বিবাহযোগ্য বয়স ১৮ বছর এবং পাত্রের ক্ষেত্রে ২১ বছর। এর কম বয়সে বিবাহ সম্পন্ন হলে সেটি বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয় এবং এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আজমীর সুমী গণমাধ্যমকে জানান, বয়স গোপন করে বা আইন ভঙ্গ করে বিয়ে সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এবং দণ্ডবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে কোনো মেয়ের বিয়ে নিবন্ধন করার ক্ষমতা কাজীর নেই। যদি কোনো কাজী এমন বিয়ে নিবন্ধন করেন, তবে তার লাইসেন্স বাতিল হতে পারে এবং তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এছাড়া, কাজীর নিবন্ধন ছাড়া কোনো বিয়েই আইনত বৈধ নয়। কোর্ট স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে বিয়ে সম্পন্ন করলেও তা বৈধ হিসেবে গণ্য হয় না।
এমনকি, কেউ যদি বিদেশে গিয়ে স্ট্যাম্পে সই করে বিয়ে করেন, তবুও বাংলাদেশি নাগরিক হলে দেশের আইন মানতে বাধ্য থাকবেন। সে ক্ষেত্রে ওই বিয়ে আইনত স্বীকৃতি পাবে না এবং তা সহবাস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ (সংশোধিত) অনুযায়ী, ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ বলতে বোঝানো হয়েছে—যে পুরুষের বয়স ২১ বছরের নিচে এবং যে নারীর বয়স ১৮ বছরের নিচে। এ ধরনের দুই পক্ষ বা এক পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে সেই বিবাহ বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয়।
আইনে বলা হয়েছে, আদালত কোনো অভিযোগ বা তথ্যের ভিত্তিতে বাল্যবিবাহ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা বন্ধে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
শাস্তির বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে আইনে উল্লেখ রয়েছে, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহে অংশ নিলে তার জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। জরিমানা পরিশোধ না করলে অতিরিক্ত কারাদণ্ডও হতে পারে। সেই হিসেবে, লুবাবার স্বামী যদি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে এই শাস্তি প্রযোজ্য হতে পারে।
অন্যদিকে, কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে বা মেয়ে বাল্যবিবাহে জড়িত থাকলে তার জন্য সর্বোচ্চ এক মাসের আটকাদেশ বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে—যদি এ ঘটনায় প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে মামলা হয়, তাহলে সাধারণত অপ্রাপ্তবয়স্ক পক্ষকে শাস্তি দেওয়া হয় না।
এছাড়া, বাল্যবিবাহ নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করলে সেটিও একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড বা ৩০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
লুবাবার বিয়ের বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হলেও সামাজিক মাধ্যমে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা থামার কোনো লক্ষণ নেই। বিষয়টি সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো নীরব রয়েছেন লুবাবা ও তার পরিবার, যা কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।