


ফেব্রুয়ারি মাসেই বাংলাদেশের ভূ-গর্ভস্থ প্লেটগুলোতে অস্বাভাবিক অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। চলতি মাসের মাত্র ২৭ দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত দশবার মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এ পরিস্থিতি সাধারণ সংখ্যাতত্ত্বের বিষয় নয়, বরং এটি বড় কোনো মহাবিপর্যয়ের পূর্বলক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পনটি অনুভূত হয় শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা ৫৪ মিনিটে, সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলায়, যার মাত্রা ছিল ৫.৩ রিখটার স্কেলে। জুমার নামাজের পরপরই এই কম্পন অনুভূত হওয়ায় দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। এর আগে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ভারতের সিকিম রাজ্যে উৎপত্তি হওয়া ৩.৭ মাত্রার ভূমিকম্প দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অনুভূত হয়।
ফেব্রুয়ারি মাসের ভূমিকম্পের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ধারা ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটের ৩ মাত্রার কম্পন দিয়ে শুরু হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মিয়ানমার কেন্দ্রিক পর পর দুটি কম্পন এবং ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি ঘটে। ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেট অঞ্চলে যথাক্রমে ৩.৩ ও ৪ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকেও ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এছাড়া ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতেও মিয়ানমারের সাংগাই অঞ্চলের মনিওয়া শহর ও মাওলাইক শহরকে কেন্দ্র করে ৫.১ মাত্রার মধ্যম শক্তির ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো উৎপত্তিস্থল। আগে বড় ভূমিকম্প সাধারণত প্রতিবেশী ভারত বা মিয়ানমারের দিকে কেন্দ্রিত থাকতো। কিন্তু গত বছরের ২১ নভেম্বর ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর থেকে কম্পনের কেন্দ্র এখন দেশের ভেতরে স্থানান্তরিত হয়েছে। নরসিংদীর মাধবদী, সাভারের বাইপাইল, রাজধানীর বাড্ডা এলাকার মতো স্থানগুলো এখন ভূ-কম্পনের এপিসেন্টার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি নির্দেশ করে যে বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরে থাকা টেকটোনিক প্লেটগুলো অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
ভূতত্ত্ববিদরা ঘন ঘন কম্পনকে বড় ধরনের দুর্যোগের পূর্বলক্ষণ হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শক্তি ছোট কম্পনের মাধ্যমে আংশিক মুক্ত হলেও, দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বড় শক্তি মুক্ত না হলে তা মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশ মূলত ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থান করছে, তাই ভূমিকম্পের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
ঢাকা ও আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ছোট কম্পন কখনো কখনো বড় ঝুঁকি কমাতে সহায়ক, কিন্তু ঢাকার নরম মাটিতে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত ভবনে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও ধ্বংসের কারণ হতে পারে। বর্তমানে দেশের প্রস্তুতি মূলত ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ভূ-বিশেষজ্ঞরা বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি, দ্রুত সংস্কার ও মানসম্মত নির্মাণে জোর দিচ্ছেন। তারা সতর্ক করে বলছেন, প্রকৃতি বারবার সংকেত দিচ্ছে; বসে থাকার সময় নেই। এখনই সমন্বিত জাতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ না করলে যেকোনো সময় দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার ভূ-তাত্ত্বিক গঠন ও জনঘনত্ব বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।