


দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়া আবারও তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, খাদ্য ঘাটতি এবং খনি খাতে অসন্তোষকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে যে, বিক্ষোভকারীরা এবার সরাসরি প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ-এর পদত্যাগ দাবি তুলেছেন। রাজধানীতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, টিয়ার গ্যাস, বিস্ফোরণ এবং রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগে নতুন করে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে বলিভিয়ার রাজনৈতিক পরিবেশ।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাজধানী লা পাজের ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় চত্বর প্লাজা মুরিলোকে ঘিরে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে চত্বরে প্রবেশের চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে, তবে আন্দোলনকারীরাও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
বিশেষ করে খনি শ্রমিকদের অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। দেশটির শক্তিশালী সংগঠন ফেডারেশন অব মাইনিং কোঅপারেটিভসের নেতৃত্বে হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমেছেন। সংঘর্ষের সময় কিছু শ্রমিক পুলিশের দিকে শক্তিশালী বিস্ফোরক নিক্ষেপ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও সহিংস করে তোলে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকার অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। খনিশ্রমিকরা বলছেন, খনির কাজে প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক ও জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং হাজার হাজার শ্রমিক জীবিকার অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তারা খনি খাতের বিভিন্ন চুক্তি পুনর্বিবেচনা এবং আধুনিক নীতিমালা চালুর দাবিও জানিয়েছেন।
এদিকে সাধারণ মানুষও দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে ক্ষুব্ধ। খাদ্য, জ্বালানি এবং মৌলিক পণ্যের সরবরাহে ঘাটতির কারণে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে অনেককে, আর বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতির জন্য সরকার বিরোধী শক্তি ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস-কে দায়ী করছে। প্রশাসনের অভিযোগ, বর্তমান সংকটকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন উসকে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো ইভো মোরালেসের বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০০৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বলিভিয়ার নেতৃত্বে ছিলেন ইভো মোরালেস। ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসেবে রাজনীতিতে উত্থান হওয়া এই বামপন্থি নেতা এখনো শ্রমজীবী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে জনপ্রিয়। এর আগেও তিনি সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে মোরালেস দাবি করেন, সরকার তাকে “বলির পাঁঠা” বানানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, বর্তমান বিক্ষোভ কোনো একক ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য থেকে সৃষ্টি হয়নি; বরং এটি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
মোরালেস আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার সংবিধান ও জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। একই সঙ্গে তিনি খাদ্য, জ্বালানি এবং অন্যান্য মৌলিক পণ্যের সংকট দ্রুত সমাধানে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, বলিভিয়ার চলমান অর্থনৈতিক সংকট দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও সহিংস হতে পারে। রাজনৈতিক বিভক্তি, শ্রমিক অসন্তোষ এবং নিত্যপণ্যের সংকট মিলিয়ে দেশটিতে নতুন করে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা