Date: April 30, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / জাতীয় / জাতীয় সংকট মোকাবেলায় একমাত্র বিকল্প আল্লাহর দীন -মেহেরপুরে কর্মী সম্মেলনে এমাম সেলিম - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে...

জাতীয় সংকট মোকাবেলায় একমাত্র বিকল্প আল্লাহর দীন -মেহেরপুরে কর্মী সম্মেলনে এমাম সেলিম

April 29, 2026 09:36:16 PM   অনলাইন ডেস্ক
জাতীয় সংকট মোকাবেলায় একমাত্র বিকল্প আল্লাহর দীন -মেহেরপুরে কর্মী সম্মেলনে এমাম সেলিম

নিজস্ব প্রতিবেদক, মেহেরপুর:
মেহেরপুরে হেযবুত তওহীদের ঈদ পুনর্মিলনী ও কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বুধবার (২৯ এপ্রিল ২০২৬) মেহেরপুরের গাংনীতে এ সম্মেলনের আয়োজন করে হেযবুত তওহীদের মেহেরপুর জেলা শাখা। 
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন হেযবুত তওহীদের শীর্ষ নেতা এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। সংগঠনের মেহেরপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক জাহিদ মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুফায়দাহ পন্নী, সাহিত্য সম্পাদক রিয়াদুল হাসান, খুলনা বিভাগীয় সভাপতি তানভীর আহমেদ, আঞ্চলিক সভাপতি জসেব উদ্দিন প্রমুখ।
সম্মেলনে হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বর্তমান বিশ্ব ও বাংলাদেশের সংকটময় পরিস্থিতি তুলে ধরে এর স্থায়ী সমাধানের রূপরেখা পেশ করেন। দুই ঘণ্টারও বেশি সময়ের দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মুসলিম বিশ্বের বিপর্যয়, বাংলাদেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বিচারিক ব্যর্থতা এবং সামাজিক অধপতন, মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ও ধর্মীয় আকিদার বিকৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

IMG_5817.jpg

বক্তব্যের শুরুতেই হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম উপস্থিত নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে গুজবের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আল্লাহ আপনাদের কান দিয়েছেন এবং মনোযোগ দিয়ে শুনতে বলেছেন। 
পবিত্র কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আল্লাহ কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে বলেছেন এবং তার মধ্যে যা উত্তম তা গ্রহণ, অনুসরণ করতে বলেছেন। গুজবকারী ফাসেকদের থেকে সতর্ক থাকতে আল্লাহ যেকোনো সংবাদ বা তথ্য যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ আজকে আমাদের সমাজে- গুজব শুনে যাচাই-বাছাই না করেই হুজুগে মাতাল হয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, হামলা-ভাংচুর-লুটপাট, হত্যার অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। আমাদের বিরুদ্ধেও একটি শ্রেণি নানা অপপ্রচারে লিপ্ত। গুজব-প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে আসছে তারা। এসব গুজবকারীদের ব্যাপারে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন তিনি এবং হেযবুত তওহীদের ব্যাপারে কোনো অপপ্রচার শুনলে তা যাচাই-বাছাই করার অনুরোধ জানান।”
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিকে ‘নরককুণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করে হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “পুরো মানবজাতির অবস্থার দিকে তাকালে আজ শুধু যুদ্ধ, মারামারি আর হানাহানি দেখা যায়। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে অন্যায়ভাবে দখল করছে, নির্যাতন চালাচ্ছে। আপনি ভেনিজুয়েলার দিকে তাকান, ইরানের দিকে তাকান। পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যখন যা খুশি করছে। পুরো পৃথিবী আজ এক অরাজক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ আজ কেবল নামমাত্র সংস্থায় পরিণত হয়েছে। মানবাধিকার বা ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠায় তারা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ”
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান করুণ দশা বর্ণনা করতে গিয়ে হেযবুত তওহীদের এই নেতা বলেন, “পৃথিবীতে আজ সংখ্যায় ২০০ কোটির উপরে হয়েও মুসলমানরা লাঞ্ছিত, নির্যাতিত। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ও তেল-গ্যাসের মালিক হওয়া সত্ত্বেয় আজ আমরা পশ্চিমাদের গোলামে পরিণত হয়েছি। ৬ কোটি মুসলমান আজ উদ্বাস্তু। তাদের ত্রাণের আশায় চেয়ে থাকে তারা। মিয়ানমারের লক্ষ লক্ষ মুসলমান আজ নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত। অথচ মুসলমানরা এক সময় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি ছিল। শিক্ষা-দিক্ষা, অর্থনীতি, সামরিক শক্তিতে তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। অর্ধপৃথিবীতে ন্যায়, শান্তি, সুবিচারের সাথে শাসন করেছে তারা। পরবর্তীতে ক্ষমতা আর ফেরকা-মাজহাবগত দ্বন্দ্ব মুসলিমদের বর্তমান দুর্দশার বাস্তবতার সম্মুখিন করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। 


বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের ব্যর্থতা চিহ্নিত করে হেযবুত তওহীদের এই নেতা বলেন, “দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৫ বছর। এর মধ্যে ১৭ বার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। ৯০-এর আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব, আমরা অনেক রক্ত দিয়েছি। কিন্তু শান্তি কি এসেছে? আমাদের স্টুডেন্টরা জীবন দিল, অথচ আজও আমরা দেখছি অপরাধ কমছে না। গত কয়েক মাসেই বাংলাদেশে শত শত হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। আদালতে প্রায় ৪৭ লক্ষ মামলা ঝুলে আছে। মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে না, নিরাপত্তা পাচ্ছে না।”
তিনি প্রচলিত শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে বলেন, “বিদ্যমান এই মানবসৃষ্ট আইন-বিধান আমাদের শান্তি দিতে পারেনি, পারবে না। ব্রিটিশরা এই ব্যবস্থা আমাদের শান্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং আমাদের শাসন ও শোষণ করার জন্য তৈরি করেছিল। পাঁচ বছর পর পর কেবল ‘বিষবৃক্ষের’ পরিচর্যাকারী পাল্টে কোনো লাভ নেই, যদি বিষবৃক্ষটিই উপড়ে ফেলা না হয়। ব্রিটিশ আমলের এই ঘুণে ধরা ব্যবস্থার পরিবর্তে মহান আল্লাহর দেওয়া দীন তথা জীবনব্যবস্থা প্রবর্তন করা এখন সময়ের দাবি।”
জাতীয় অর্থনীতির সংকট নিয়ে হেযবুত তওহীদের সর্বোচ্চ নেতা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “সুদভিত্তিক এই পুঁজিবাদী অর্থনীতি পুরো জাতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন, অথচ আমাদের পুরো অর্থনীতির বুনিয়াদ সুদের ওপর দাঁড়িয়ে। ব্যাংকের সুদের মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষ আজ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সুদের পরিবর্তে আল্লাহর দেওয়া বাজারনীতি ও ইনসাফভিত্তিক অর্থনীতি কায়েম না হবে, ততক্ষণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না।”
বক্তব্যের এক পর্যায়ে অত্যন্ত চমৎকার উপমায় জীবনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেন, একটি ঘড়ি যদি সময় না দেয়, তবে তার কোনো মূল্য নেই। একটি গাড়ি যদি গন্তব্যে না পৌঁছায়, তবে তা অকেজো। তেমনি আল্লাহ মানুষকে ‘খলিফা’ বা প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আমরা যদি আল্লাহর সেই প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন না করি, তবে আমাদের জীবন ব্যর্থ। একজন মানুষ যখন সৌদি আরব যায় উপার্জনের জন্য, সে তার লক্ষ্য জানে। কিন্তু আমরা এই দুনিয়াতে কেন এসেছি, সেই লক্ষ্য আজ আমরা ভুলে গেছি। কোরআনের আলোকে মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য তুলে ধরে তিনি মানুষের মূল ইবাদত আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করার কথা মনে করিয়ে দেন।
শয়তানের ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ইবলিস শপথ করেছিল সে মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করবে। আজ ইবলিস সফল হয়েছে কারণ সে মানুষকে আল্লাহর হুকুম থেকে সরিয়ে মানুষের তৈরি বিধানের অধীনে নিয়ে এসেছে। আজ আমরা নামাজ পড়ি, রোজা রাখি কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক জীবনে মানুষের তৈরি আইন মানি। কোরআনের আল্লাহর হঁশিয়ারি মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, যারা আল্লাহর বিধান দিয়ে ফয়সালা করে না, তারা কাফের, জালেম, ফাসেক। এই শিকল ভাঙার আহ্বান জানান তিনি।

সংগঠনের কর্মসূচি ও লক্ষ্য তুলে ধরে এমাম সেলিম বলেন, “হেযবুত তওহীদ আজ মানুষকে আল্লাহর তাওহীদের দিকে ডাকছে। এক আল্লাহ, এক রাসূল এবং এক কুরআনের অধীনে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রসুল (সা.) এর মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া ঐক্য, শৃঙ্খলা, আনুগত্য, হিজরত ও জিহাদ Ñএই কর্মসূচির গ্রহণ করার তাগিদ দেন তিনি।
তিনি মনের করিয়ে দেন, জিহাদ মানে বোমাবাজি বা সন্ত্রাস নয়। জিহাদ হচ্ছে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ সংগ্রাম করার নাম। 
তিনি সংগঠনের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ নৈতিকতা নিয়ে বলেন, “হেযবুত তওহীদের কোনো সদস্য মাপে কম দেবে না, পণ্যে ভেজাল দেবে না, মিথ্যা বলবে না এবং মাদক বা সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত হবে না। আমরা একে অপরের বিপদে ভাই হয়ে দাঁড়াব। কোনো সদস্য যেন খাদ্যের অভাবে বা চিকিৎসার অভাবে মারা না যায়। এই ভাতৃত্ববোধই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।”
আসন্ন বৈশ্বিক সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “বাংলাদেশ আজ বিশ্ব রাজনীতির ভরকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। বড় বড় পরাশক্তিগুলো- চীন, ভারত ও আমেরিকা এখানে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই করছে। মিয়ানমারের সীমান্ত অশান্ত, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধাহত, ক্ষত-বিক্ষত। এই আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির প্রভাবে আমাদের দেশেও জ্বালানি সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হচ্ছে। এক ভয়াবহ বিপর্যয় সুনামির মতো ধেয়ে আসছে। সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের সাবধান হতে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। 
জাতীয় আন্তর্জাতিক যাবতীয় সঙ্কট থেকে উত্তরণের একমাত্র বিকল্প পথ হলো আল্লাহর তওহীদ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা নেই Ñএই কলেমার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং আল্লাহর তওহীদ, দীনকে জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করা। এর বিকল্প কোনো পথ নেই Ñবলেন হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। 
বক্তব্যের শেষে মেহেরপুরের হাজার হাজার জনতার উদ্দেশ্যে আহ্বান জানিয়ে এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “আপনারা কি আল্লাহর বিধান চান? (উপস্থিত জনতা হাত তুলে বলেন: হ্যাঁ)। আপনারা কি মানুষের তৈরি ব্যর্থ বিধান চান? (জনতা: না)। তবে আজ থেকে এই সত্যকে ধারণ করুন। প্রতিটি ঘরে ঘরে তাওহীদের এই বাণী পৌঁছে দিন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) -এর প্রকৃত অর্থ হলো আল্লাহর হুকুম ছাড়া আমি অন্য কারো হুকুম বা আইন মানি না। এই দৃঢ় বিশ্বাস যদি আমরা ধারণ করতে পারি, তবে এই মেহেরপুর থেকেই একদিন গোটা বিশ্বে শান্তির আলো ছড়িয়ে পড়বে, ইনশাল্লাহ!”
হেযবুত তওহীদের খুলনা সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান মিলনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের মেহেরপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী উপস্থিতি ছিলেন। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক বিশাল সমাবেশে পরিণত হয়। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে উপস্থিতিদের থেকে আসা বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন হেযবুত তওহীদের এমাম।