


রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে এক বছরের শিশু রিফাত হাসানকে নিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন তার মা আকলিমা খাতুন। তিনি জানান, সাত দিন আগে ছেলের জ্বর শুরু হয় এবং পরে শরীরে র্যাশ ওঠে। বেসরকারি একটি ক্লিনিকে চিকিৎসক এটিকে হামের লক্ষণ হিসেবে শনাক্ত করে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। বর্তমানে শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের বারান্দাতেই ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে তাকে।
আকলিমা খাতুন বলেন, তার ছেলে এখনো হামের টিকা পায়নি। শুধু হামের নয়, অন্যান্য টিকারও বেশ কিছু ডোজ দেওয়া হয়নি। ইপিআই কেন্দ্রে একাধিকবার গিয়েও টিকা না পাওয়ায় ফিরে আসতে হয়েছে বলে জানান তিনি। ফলে বাধ্য হয়েই শিশুটি টিকাবিহীন অবস্থায় রয়েছে।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার বড় একটি কারণ টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন। প্রতি বছর দেশে প্রায় ৪০ লাখ শিশু জন্ম নেয়, যাদের ১১টি রোগ প্রতিরোধে জন্মের পর থেকে ১৮ মাস বয়স পর্যন্ত আট ধরনের টিকা দেওয়ার কথা। তবে সাম্প্রতিক সময় টিকা সরবরাহে ঘাটতির কারণে এই কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় এসেছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৮৫ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২২ ও ২০২১ সালে ৯৭ শতাংশের বেশি ছিল। এমনকি করোনা মহামারির সময়ও টিকাদানের হার তুলনামূলক ভালো ছিল।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের জুনে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহে জটিলতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় সরবরাহে বিলম্ব ঘটে। এতে টিকাদান কর্মসূচি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, অপারেশন প্ল্যান বন্ধ করে দেওয়া একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত ছিল, যার ফলে টিকা কর্মসূচিতে সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, টিকা সংকট অব্যাহত থাকলে হামসহ অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিস্তার আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অপারেশন প্ল্যান বন্ধ করে দেওয়ায় স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতের গুণগত পরিবর্তনে কিছুই করেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত টিকা সরবরাহ স্বাভাবিক করা, ইপিআই কর্মসূচি শক্তিশালী করা এবং স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন ছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হবে। অন্যথায় শিশু স্বাস্থ্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।