Date: April 25, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / জাতীয় / মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিতে রাজধানীতে হেযবুত তওহীদের গোলটেবিল বৈঠক - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্...

মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিতে রাজধানীতে হেযবুত তওহীদের গোলটেবিল বৈঠক

April 25, 2026 07:26:49 PM   অনলাইন ডেস্ক
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিতে রাজধানীতে হেযবুত তওহীদের গোলটেবিল বৈঠক

শাহাদৎ হোসেন:
রাজধানীতে ‘মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিতে আমাদের প্রস্তাবনা’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (২৫ এপ্রিল ২০২৬) ঢাকার পুরানা পল্টনস্থ ফারস হোটেল এন্ড রিসোর্টসে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে হেযবুত তওহীদ। অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেন হেযবুত তওহীদের সর্বোচ্চ নেতা এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। তিনি তার বক্তব্যে বর্তমান বিশ্বের অস্থির পরিস্থিতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বাক-স্বাধীনতা হরণের বৈশ্বিক ও জাতীয় চিত্র তুলে ধরেন। বিশেষ করে ফিলিস্তিন ও মিয়ানমারের চলমান সংকট এবং বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের ‘মব জাস্টিস’ বা মব সন্ত্রাস নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি প্রচলিত শাসনব্যবস্থা ও মতাদর্শের ব্যর্থতা চিহ্নিত করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার রূপরেখা পেশ করেন।

অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফ আলী, মানবজমিনের নির্বাহী সম্পাদক শামীমুল হক এবং এনটিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক (সংবাদ ও সমসাময়িক বিষয়) ফখরুল আলম খান। অন্যান্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন গ্রিন ওয়াচের সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, দৈনিক কালবেলার বার্তা প্রধান ও বিশেষ প্রতিনিধি মো. কবির হোসেন, বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ প্রতিনিধি এস এম আব্বাস এবং দ্য ফিন্যান্সিয়াল পোস্টের মার্কেটিং ডেপুটি ম্যানেজার মো. মেহেদী হাসান।

এছাড়া হেযবুত তওহীদের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুফায়দাহ পন্নী, ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ এবং এস এম সামসুল হুদা সহ বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। গোলটেবিল বৈঠক শেষে উপস্থিত সুধীজনের ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠান সমাপ্ত করা হয়।

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম তার বক্তব্যে বলেন, মানবাধিকার, বাক-স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিটি মানুষের জন্মগত ও প্রাকৃতিক অধিকার। যারা ঈশ্বরতত্ত্বে বিশ্বাস করেন না, তাদের কাছে এটি প্রকৃতি প্রদত্ত অধিকার আর যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করেন, তাদের কাছে এটি আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমানে সারা বিশ্বে উন্নত বা অনুন্নত সব জায়গাতেই মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বাক-স্বাধীনতা হরণের এক পৈশাচিক উৎসব চলছে। চারদিকে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, দরিদ্রের ওপর ধনীর বঞ্চনা এবং শাসিতের ওপর শাসকের জুলুম চলছে। পৃথিবীকে তিনি বর্তমানে এক নরককুণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেন এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় খোঁজার আহ্বান জানান।

হেযবুত তওহীদের প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেন, এই আন্দোলনটি ১৯৯৫ সালে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী পন্নী পরিবারের উত্তরসূরী মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক, সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব এবং একজন ভার্সেটাইল জিনিয়াস। এমামুযযামান বায়াজীদ খান পন্নী কেন এই আন্দোলন শুরু করলেন সেই ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, পন্নী সাহেব একসময় ভেবেছিলেন যে মুসলিম জাতি একদা জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও সামরিক শক্তিতে বিশ্বসেরা ছিল। যে জাতি রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের মতো সুপার পাওয়ারকে পরাজিত করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই জাতি আজ কেন পরাধীন এবং লাঞ্ছিত। তিনি গবেষণা করে দেখলেন, মুসলমানরা তাদের মূল ভিত্তি অর্থাৎ আল্লাহর তওহীদ বা সার্বভৌমত্ব থেকে বিচ্যুত হয়েছে। বর্তমানের ২৪০ কোটি মুসলমান আজ হাজারো ফেরকা ও মাজহাবে বিভক্ত হয়ে নিজেরা নিজেদের মধ্যে রক্তারপি করছে।

সংগঠনের মূলনীতি ও কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে হেযবুত তওহীদের এমাম বলেন, এটি একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন। এর মূল নীতি হলো প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না হওয়া, কোনো অবৈধ অস্ত্রের সংস্পর্শে না যাওয়া এবং ধর্মের দালালি বা বিনিময় না নেওয়া। তিনি রসুলুল্লাহর অনুসৃত পাঁচ দফা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন, যা হলো ঐক্যবদ্ধ হওয়া, শৃঙ্খলার মধ্যে আসা, নেতার আনুগত্য করা, হিজরত এবং জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করা। তিনি বলেন, আমরা যখন এই শান্তিময় আদর্শ প্রচার শুরু করলাম, তখন তথাকথিত ধর্ম ব্যবসায়ীরা আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা শুরু করল। তারা আমাদের নাস্তিক, কাফের বা ইহুদির দালাল বলে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আমাদের জীবনের ওপর আক্রমণ করল। আমাদের পাঁচজন সদস্য শহীদ হয়েছেন এবং শত শত সদস্য মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমনকি হিজবুত তাহরীরের সাথে নামের আংশিক মিল থাকার কারণেও আমাদের অনেক জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রসঙ্গে হেযবুত তওহীদের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে উদ্যোগ  নেওয়া হয় তা প্রশংসনীয়। কিন্তু আমি মনে করি কেবল সংবিধানে কিছু কাটছাঁট করে মুক্তি আসবে না। গত কয়েক দশকে সংবিধান অনেকবার সংশোধন করা হয়েছে কিন্তু মানুষের মুক্তি আসেনি। বর্তমানে দেশে গণতন্ত্রের বদলে ‘মোবোক্রেসি’ বা মব সন্ত্রাস চলছে। তিনি বর্তমান সরকারকে প্রস্তাব দিয়ে বলেন, আপনারা পাঁচ বছর পর পর বিষবৃক্ষের পরিচর্যাকারী পাল্টাচ্ছেন কিন্তু বিষবৃক্ষটি উপড়ে ফেলছেন না। ব্রিটিশরা আমাদের যে রাজনৈতিক, বিচারিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামো দিয়ে গেছে, তা মানুষের তৈরি এবং এটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্রিটিশ আমলের ব্যবস্থার পরিবর্তে মহান আল্লাহর দেওয়া ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা প্রবর্তন করাই এখন সময়ের দাবি।

তিনি তার বক্তব্যের গভীর পর্যালোচনায় বলেন, আমাদের বিদ্যমান ব্যবস্থা পাল্টানোর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি আমাদের ইমানি বাধ্যবাধকতা। আল্লাহ বলেছেন ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ করতে। নামাজ পড়া যেমন ফরজ, আদালতের বিচারিক কাজ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আল্লাহর বিধান অনুযায়ী করাও তেমনি ফরজ। দ্বিতীয়ত, প্রচলিত মানুষের তৈরি ব্যবস্থা আমাদের শান্তি দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে নিম্ন আদালতে ৪১ লক্ষ মামলা ঝুলে আছে। মানুষ সামান্য জমির জন্য মামলা করে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। ১৬ পারসেন্ট সুদের বোঝা জাতির ওপর চেপে আছে এবং দেশ আজ ঋণের জালে জর্জরিত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ধর্ম মানে কেবল তসবিহ পাঠ করা নয়, ধর্ম হলো বাস্তব জীবনের সংকট সমাধানের নাম।

বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম তার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনায় বলেন, আমাদের বর্তমান বিচার ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘসূত্রিতায় ভরা। আমি এমন এক বিচার ব্যবস্থার প্রস্তাব দিচ্ছি যেখানে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বিচার হবে এবং অধিকাংশ মামলা স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তি হবে। তিনি বলেন, চুরির দায়ে হাত কাটার মতো যে কঠোর বিধান ইসলামে আছে, তা আসলে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ। যদি বড় বড় অর্থ পাচারকারীদের ক্ষেত্রে এই কঠোর শাস্তি কার্যকর থাকত, তাহলে দেশ আজ নিঃস্ব হতো না। বর্তমানে অপরাধীকে না পেয়ে অপরাধীর আত্মীয়স্বজনকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে, যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। অথচ আল্লাহর আইনি কাঠামোতে বিচার হলে এই নৈরাজ্য বন্ধ হতো।

দেশের সামরিক নীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হেযবুত তওহীদের নেতা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আমাদের সামরিক নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা দরকার। তিনি সুইজারল্যান্ডের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে প্রতিটি সক্ষম নাগরিককে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আমাদের ১৮ কোটি মানুষকে কেবল দুই লক্ষ সৈন্য রক্ষা করতে পারবে না। পুরো জাতিকে সুশৃঙ্খল ও সামরিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে যাতে বহিঃশত্রুর মোকাবিলা করা সহজ হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের শিক্ষিত এলিটরা দেশপ্রেমের চেয়ে বিদেশের সম্পদ গড়ার দিকে বেশি মনোযোগী। এই মানসিকতা পাল্টাতে হলে ইসলামের সামরিক দর্শন অনুসরণ করতে হবে।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে না এলে সাধারণ মানুষের মুক্তি নেই। তিনি জাপান ও সুইজারল্যান্ডের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তারা দীর্ঘ সময় সুদমুক্ত বা জিরো ইন্টারেস্ট রেট পলিসি অনুসরণ করে সফল হয়েছে। আমাদের অর্থনীতির বুনিয়াদ হবে সুষম বণ্টন এবং সুদমুক্ত বাণিজ্যিক নীতি। তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি। একে ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়। এই গভীর রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রভাবে সরকারও অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে। এর থেকে বাঁচতে হলে আল্লাহর দেওয়া অর্থনৈতিক কাঠামো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল শিক্ষিত ডাকাত তৈরি করছে। এখানে নৈতিকতার কোনো স্থান নেই। ব্রিটিশরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ধ্বংস করেছে একদিকে অসম্পূর্ণ মাদ্রাসা শিক্ষা আর অন্যদিকে ধর্মহীন জেনারেল শিক্ষা। মাদ্রাসায় কেবল ছোটখাটো মাসলা-মাসায়েল আর তর্কের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির স্থান নেই। অন্যদিকে জেনারেল শিক্ষায় বাচ্চার মগজ ধোলাই করা হচ্ছে পাশ্চাত্য দর্শনে। তিনি এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন যা একাধারে বিজ্ঞানভিত্তিক এবং নৈতিকতাসম্পন্ন হবে। যেখানে একজন শিক্ষার্থী আধুনিক জ্ঞানের পাশাপাশি একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক এবং সত্যবাদী মোমেন হিসেবে গড়ে উঠবে।

নারী অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে তিনি বলেন, প্রচলিত একটি ধারণা আছে যে ইসলাম ক্ষমতায় আসলে নারীদের অধিকার হরণ করা হবে। কিন্তু রসুলের সময়কার প্রকৃত ইসলাম ছিল এর উল্টো। উম্মে আম্মারা ওহুদের যুদ্ধে রসুলকে প্রাণ দিয়ে রক্ষা করেছেন। যুদ্ধের ময়দানে, মসজিদের খুতবায়, ঈদের নামাজে নারীরা অংশগ্রহণ করতেন। তিনি বলেন, বর্তমানে যে বোরকা বা পর্দার বাড়াবাড়ি চলছে, তা অনেক ক্ষেত্রে রসুলের শিক্ষার বিপরীত। প্রকৃত ইসলাম কায়েম হলে একজন নারী অলঙ্কার পরিহিত অবস্থায় রাতের অন্ধকারে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া একা ঘুরে বেড়াতে পারবে এবং কেউ তাকে স্পর্শ করার সাহস পাবে না। বর্তমানে গণতন্ত্রের যুগে বৃদ্ধা থেকে শুরু করে শিশু যেভাবে ধর্ষিত হচ্ছে, তা দেখেও কি আমরা বুঝব না যে আমাদের বর্তমান ব্যবস্থা ব্যর্থ?

সংস্কৃতি ও সঙ্গীত প্রসঙ্গে হেযবুত তওহীদের এমাম বলেন, ইসলাম কখনোই সুস্থ সংস্কৃতির পথ রুদ্ধ করেনি। বর্তমান আলেমরা বাদ্যযন্ত্র বা গানকে যে ঢালাওভাবে হারাম বলেন, তা কোরআন ও হাদিসের প্রকৃত ব্যাখ্যা নয়। তিনি বলেন, গান বা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বর্জনীয় হলো অশ্লীলতা, নগ্নতা এবং আল্লাহর নাফরমানি। রসুলের সামনে গান গাওয়া হয়েছে কিন্তু তিনি কেবল বিতর্কিত অংশটুকু সংশোধন করতে বলেছেন, গান বন্ধ করতে বলেননি। পহেলা বৈশাখ বা জাতীয় সংস্কৃতির উৎসবগুলোকে যারা ঢালাওভাবে শিরক বা হারাম বলেন, তারা আসলে ইসলামকে মানুষের কাছে ভীতিকর করে তুলছেন। সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে মানুষের বাক-স্বাধীনতা থাকতে হবে যদি তা সমাজে কোনো অস্থিরতা তৈরি না করে।

রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং কথিত থিওলজিক্যাল স্টেটের আতঙ্ক নিয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, আমাদের প্রস্তাবিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা কোনো যাজকতন্ত্র বা রাজতন্ত্র নয়। ইসলামে পোলা রাজা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং একজনের মত চাপিয়ে দেওয়ার নাম ইসলাম নয়। এটি হবে একটি ‘শুরা’ বা পরামর্শভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। তবে পার্থিব আইনের পরিবর্তে মূল ভিত্তি হবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। তিনি প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের দর্শন উল্লেখ করে বলেন, নেতৃত্বের কেন্দ্রে একজন যোগ্য নেতা থাকা জরুরি যাকে সবাই আনুগত্য করবে। ইসলামের এই নেতৃত্ব কাঠামোকে বলা হয় ‘ওলিল আমর’। এখানে ফ্যাসিবাদ বা একনায়কতন্ত্রের কোনো স্থান নেই।

বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, মিডিয়া আজ এক অদৃশ্য শক্তির ভয়ে আমাদের কণ্ঠরোধ করতে চায়। আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হয় কিন্তু আমাদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয় না। তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা ভয়হীনভাবে সত্য প্রকাশ করেন। বর্তমান ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মায়ানমার ইস্যু, চীন-ভারত দ্বন্দ্ব এবং আমেরিকার হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় আমরা এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। ইরাক বা সিরিয়ার মতো পরিস্থিতি যদি এখানে সৃষ্টি হয়, তবে আমাদের বাঁচার কোনো পথ থাকবে না।

হেযবুত তওহীদের এমাম এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রথা ত্যাগ করে আল্লাহর দেওয়া ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করার আহ্বান জানান। তিনি তার প্রস্তাবিত রাষ্ট্র ও জীবনব্যবস্থার খসড়াটি বিজ্ঞজনদের পড়ার অনুরোধ করেন এবং যেকোনো যুক্তিসঙ্গত পরামর্শ গ্রহণ করার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, আসুন আমরা কেবল নিজের জন্য না ভেবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও ন্যায়বিচারপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে একতাবদ্ধ হই। তিনি সকলকে এই আন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেন।

আলোচনা সভায় আমন্ত্রিত অতিথিরা মানবাধিকার রক্ষা ও উগ্রবাদ নির্মূলে হেযবুত তওহীদের প্রস্তাবনাগুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বক্তারা বলেন, সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়, বরং আদর্শিক লড়াই ও সঠিক প্রচারণার মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। তারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় গণমাধ্যম যোগাযোগ সম্পাদক শারমিন সুলতানা চৈতী, ঢাকা বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক ফরিদ উদ্দিন রব্বানী, ঢাকা দক্ষিণের কার্যনির্বাহী সদস্য তসলিম উদ্দিন প্রমুখ।