Date: April 28, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / বিশেষ নিবন্ধ / সোনার মাটিতে ভিনদেশি বিষ: বাণিজ্যচুক্তির আড়ালে দেশি কৃষিকে হত্যার আয়োজন! - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রক...

সোনার মাটিতে ভিনদেশি বিষ: বাণিজ্যচুক্তির আড়ালে দেশি কৃষিকে হত্যার আয়োজন!

April 27, 2026 09:38:13 PM   অনলাইন ডেস্ক
সোনার মাটিতে ভিনদেশি বিষ: বাণিজ্যচুক্তির আড়ালে দেশি কৃষিকে হত্যার আয়োজন!

শাহাদৎ হোসেন:
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো এই মাটির কৃষক। কৃষকদের আমরা বলি, সব সাধকের বড় সাধক। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে তারা যে ফসল ফলায়, তা দিয়েই আমাদের আঠারো কোটি মানুষের পেট চলে। কিন্তু অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হওয়া যে ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’র খবর আমরা জানতে পারছি, তা পড়ার পর গভীর এক শঙ্কা জাগছে। এই চুক্তির আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি আমাদের কৃষিখাতকে উন্নতির দিকে নেওয়ার বদলে উল্টো সমূলে ধ্বংস করার এক নিপুণ নকশা। এই অসম চুক্তির ফলে আমাদের সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ কৃষকের জীবন যেভাবে ঝুঁকির মুখে পড়বে, তা নিয়ে এখনই খোলাখুলি কথা বলা প্রয়োজন।

চুক্তির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো আমদানির বাধ্যবাধকতা। আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের ওপর কঠিন শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আমাদের প্রতি বছর অন্তত সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার কৃষিপণ্য নির্দিষ্টভাবে আমেরিকা থেকেই কিনতে হবে। এর মধ্যে আছে ৭ লক্ষ টন গম, ২৬ লক্ষ টন সয়াবিন এবং বিপুল পরিমাণ তুলা। প্রশ্ন হলো, একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমরা কোত্থেকে পণ্য কিনব, সেটা কেন অন্য একটি দেশ ঠিক করে দেবে? আন্তর্জাতিক বাজারে যখন অন্য কোনো দেশ থেকে সুবিধাজনক শর্তে গম বা সয়াবিন পাওয়ার সুযোগ থাকবে, তখনও কি আমরা এই চুক্তির বেড়াজালে আটকে পড়ে নির্দিষ্ট এক দেশ থেকে পণ্য কিনতে বাধ্য থাকব না? এই বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে আমাদের সাধারণ মানুষের ওপর যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে, তার দায়ভার আসলে কে নেবে? তার থেকেও বড় কথা হলো- অথচ এসব পণ্য বাংলাদেশেই উৎপাদন সম্ভব।

এখন নজর দেওয়া যাক আমাদের প্রান্তিক কৃষকদের দিকে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে ডেইরি বা দুগ্ধ শিল্প এবং পোল্ট্রি শিল্প নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামে গ্রামে হাজার হাজার তরুণ শিক্ষিত যুবক খামার করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। কিন্তু চুক্তির পরিশিষ্ট ৩ এ পরিষ্কার বলা আছে, আমেরিকার দুগ্ধজাত পণ্য এবং মাংস কোনো রকম গুণগত পরীক্ষা বা কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই সরাসরি বাংলাদেশের বাজারে ঢুকবে। এমনকি আমেরিকার গরুর মাংস, হাঁস-মুরগি এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের জন্য কোনো বিশেষ লাইসেন্স বা নিবন্ধনের প্রয়োজনও পড়বে না। যখন আমেরিকার বিশাল ভর্তুকি পাওয়া খামারের পণ্য আমাদের বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করবে, তখন আমাদের সাধারণ খামারিরা কোথায় দাঁড়াবে? আমাদের ক্ষুদ্র খামারিরা কি তাদের বিলিয়ন ডলারের কর্পোরেট খামারের অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে? উত্তরটা খুব পরিষ্কার, আমাদের তিল তিল করে গড়ে ওঠা দেশি কৃষি ও পোল্ট্রি শিল্প কয়েক বছরের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়বে।

আরেকটি চরম উদ্বেগের বিষয় হলো ‘জিএমও’ বা জেনেটিক্যালি মোডিফাইড খাদ্য। চুক্তির অনুচ্ছেদ ১.৬ এ বলা হয়েছে, আমেরিকা যেসব কৃষিপণ্যকে নিরাপদ বলবে, বাংলাদেশ সেগুলো কোনো ধরনের নিজস্ব ল্যাবরেটরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মেনে নিতে হবে। এমনকি মাত্র ২৪ মাসের মধ্যে আমাদের এমন এক আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে যেখানে মার্কিন ল্যাবে অনুমোদিত যেকোনো বীজ বা খাবার সরাসরি আমাদের কৃষিজমিতে প্রবেশের বৈধতা পাবে। এটি শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি নয়, বরং আমাদের আদি ও অকৃত্রিম প্রাকৃতিক বীজ ব্যবস্থাকে চিরতরে বিলুপ্ত করে দেওয়ার একটি ষড়যন্ত্র। এই ভিনদেশি বিষাক্ত বীজের প্রভাবে আমাদের দেশীয় জাতের শস্যগুলো হারিয়ে যাবে। আমরা জানি, মার্কিন কোম্পানিগুলো একবার তাদের পেটেন্ট করা হাইব্রিড বীজ কোনো দেশে ঢোকাতে পারলে সেই দেশের কৃষকরা বীজের জন্য সারা জীবনের জন্য ওই কোম্পানিগুলোর দাসে পরিণত হয়। আমাদের এই উর্বর সোনার মাটিতে কি আমরা জেনেশুনে ভিনদেশি বীজের বিষ ঢেলে দেব?

আমাদের প্রধান রপ্তানি খাত হলো তৈরি পোশাক। চুক্তিতে বলা হয়েছে, আমাদের পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক সুবিধা দেওয়া হবে, কিন্তু সেখানে একটি সূক্ষ্ম ফাঁদ পাতা আছে। এই সুবিধা পেতে হলে শর্ত হলো সেই পোশাক বানাতে মার্কিন তুলা বা সুতা ব্যবহার করতে হবে। এর মানে হলো, আমাদের পোশাক শিল্পকেও আমেরিকার কৃষি খামারের ওপর চিরস্থায়ীভাবে নির্ভরশীল করে তোলা হচ্ছে। আমাদের আমদানিকারকরা ভারত, মিশর বা অন্য যেকোনো দেশ থেকে নিজেদের পছন্দের তুলা আনার স্বাধীনতা হারাবে। এক কথায় বলতে গেলে, এটি আমাদের শিল্প এবং কৃষি উভয়কেই এক সুতোয় বেঁধে আমেরিকার বাজারের জিম্মি করার একটি সুদূরপ্রসারী অপকৌশল।

এই চুক্তিতে শুধু কৃষি নয়, বরং আমাদের জাতীয় ও বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্বকেও চরম সংকটে ফেলা হয়েছে। চুক্তির ৪.১ এবং ৪.২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আমেরিকার ‘শত্রু’ হিসেবে পরিচিত কোনো দেশের সাথে আমরা স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করতে পারব না। রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল আনা কিংবা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি কেনা, সব কিছুতেই এখন ওয়াশিংটনের অনুমতি লাগবে। এমনকি আমাদের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সাথেও আমরা স্বাধীনভাবে বড় কোনো লেনদেন করতে পারব কি না, তা নিয়ে চুক্তিতে মারাত্মক অস্পষ্টতা রয়েছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেন অন্য কোনো দেশের মর্জির ওপর ঝুলে থাকবে?
সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের জায়গা হলো এই চুক্তির সময়কাল এবং বর্তমান সরকারের ম্যান্ডেট। একটি অন্তর্বর্তী সরকার, যাদের মূল আইনি দায়িত্ব ছিল একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করা, তারা কীভাবে ৩০ বছরের মতো একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং নীতিনির্ধারণী চুক্তিতে দেশকে আবদ্ধ করতে পারে? এই নৈতিক অধিকার তাদের কে দিয়েছে? জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে হোয়াইট হাউস থেকে এই চুক্তির ঘোষণা আসা কি সাধারণ কোনো ঘটনা? এর মানে কি এই নয় যে, তারা জানতেন একটি নির্বাচিত সংসদ বা প্রকৃত জনপ্রতিনিধিরা কখনোই জনগণের স্বার্থবিরোধী এমন একটি আত্মঘাতী চুক্তি মেনে নেবেন না?

চুক্তির সমর্থকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, আমরা ২৫০০ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা আমেরিকা থেকে যা আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছি তার তুলনায় রপ্তানি সুবিধার তালিকাটি অত্যন্ত ছোট এবং কঠিন শর্তে ঘেরা। আমরা ঔষধ রপ্তানির সুবিধা পাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে আমাদের দেশি ঔষধের বিশাল বাজারও মার্কিনিদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিতে হচ্ছে। এমনকি মার্কিন ঔষধের কোনো গুণগত মান যাচাই করার ক্ষমতাও আমাদের ওষুধ প্রশাসন হারাবে। এতে গত কয়েক দশকে আমাদের ঔষধ শিল্পের যে গৌরবময় বিকাশ হয়েছে, তা-ও চরম হুমকির মুখে পড়বে।

বাংলাদেশ কোনো দাতা দেশের বাণিজ্যিক পরীক্ষাগার নয়। আমাদের কৃষক যদি নিজের মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ফসল ফলিয়ে ন্যায্য বাজার না পায়, তবে এই তথাকথিত উন্নয়নের আড়ালে আমাদের মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে পড়বে। এই চুক্তি সরাসরি আমাদের কৃষকের ভাতের থালায় লাথি মারার শামিল। এটি আমাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে মার্কিন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর মর্জির ওপর ছেড়ে দেওয়া। আমরা কি সত্যিই চাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম নিজেদের জমিতে অন্য দেশের দয়া বা তাদের ল্যাবরেটরিতে তৈরি বীজের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকুক? নাকি নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতার দ্বারা দেশের কৃষি শিল্পের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখুক।

এখনও সময় আছে এই চুক্তির ভয়াবহতা নিয়ে পুনরায় ভাবার। জনগণের সামনে এই চুক্তির প্রতিটি ধারা স্পষ্ট করা দরকার। কোনো ‘নন-ডিসক্লোজার’ বা গোপন চুক্তির দোহাই দিয়ে একটি জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার করা যেতে পারে না। আমরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাই, কিন্তু সেই বাণিজ্যের নামে দেশের কৃষককে বলি দিয়ে কিংবা জাতীয় সার্বভৌমত্ব বন্ধক রেখে নয়। আমাদের কৃষকদের ঘাম আর শ্রমের বিনিময়ে যে অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে, তাকে কোনো অসম চুক্তির বেড়াজালে আটকে ফেলার অধিকার কারও নেই। তাই জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষায় এবং আমাদের মাটির স্বার্থে এই আত্মঘাতী চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না; আর ক্ষমা করবে না এই গোপন চুক্তির মাধ্যমে দেশকে জিম্মি করা বিশ্বাসঘাতক অন্তবর্তীকালীন সরকারকে।

তিন মাসের মধ্যে চুক্তি রিভিউ করার সুযোগ থাকলেও বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই! পররাষ্ট্র উপদেষ্টা কাম পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহামানের ভাষ্য অনুযায়ী পিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এই চুক্তির বিষয়ে অবগত ছিল। জামায়াত তা সরাসরি অস্বীকার করলেও বিএনপির পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো স্টেটমেন্ট দেওয়া হয়নি। তার থেকেও বড় কথা হলো- সংসদে ছোট-খাটো নানা বিষয় নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ, তর্ক, কাইজ্জা চললেও এই প্রসঙ্গে কেউ প্রশ্ন তুলছে না। বিরোধীদল সংসদে সুপার সক্রিয়তা দেখালেও এই বিষয়ে একটি কথাও তুলছে না তারা। অথচ চুক্তি বাতিল কিংবা রিভিউয়ের এখনো প্রায় একমাসের মতো সময় হাতে আছে। তাহলে কি আমরা ধরে নিব যে, এই চুক্তির ব্যাপারে সবাই সত্যিই ওয়াকিবহাল ছিল? আমেরিকার সান্নিধ্য পেতে এবং তার বিরাগভাজন হবার ঝুঁকিমুক্ত থাকতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্যারের মতো গুরুজনকে কেউ ‘না’ বলতে পারেনি!