


কথক দা:
আমরা যেন আইয়্যামে গুজবে বাস করছি। অপতথ্য আর অপসংবাদের ভীড়ে কোনটা সত্য আর কোনটা অর্ধসত্য এবং কোনটা মিথ্যা তা বোঝা খুবই মুশকিল। একসময় এই গুজব সীমাবদ্ধ ছিল চায়ের দোকানের আড্ডায়। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সেই গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে বৈশ্বিক পরিসরে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো এখন গুজব ছড়ানোর মস্তবড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
একসময় কিছু গুজববেত্তা বিদেশের মাটিতে বসে অপতথ্য ছড়াতো। তাদের হাত ধরে দেশেও তৈরি হয়েছে অনেক গুজবেত্তা। প্রবাসী গুজববেত্তাদের পথ ধরে দেশীয় গুজবচক্র আরও সংগঠিত, আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে দিন দিন। চায়ের দোকানের গীবত, পরচর্চা বা পরশ্রীকাতরতা আজকের ভয়ঙ্কর অনলাইন গুজবের কাছে খুবই তুচ্ছ। এই সংস্কৃতি এক মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে সমাজব্যবস্থাকে।

“ঝড় আসলে পীরের গায়েও লাগে!”
এই গুজব রটনাকারী চক্র ছাড় দিচ্ছে না কাউকে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী, স্পোর্টসম্যান, ইসলামী চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী কেউই রেহাই পাচ্ছেনা এদের হাত থেকে। সমাজে মহামারী আকার ধারণ করেছে এসব অপরাধ। আজ থেকে নয় কয়েকবছর আগে থেকেই চলছে এসব। ৫ আগস্টের পরে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। এই গুজব ও অপপ্রচার এখন এমন এক ছোঁয়াচে রোগে পরিণত হয়েছে, যা সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অতীতে সরকারগুলো এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এই নোংরা কৌশলকেই ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে গুজবকারীরা একপ্রকার উৎসাহ পেয়েছে, এবং এই অপসংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। আজ অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, গুজবকারীরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি বা তার পরিবারকেও ছাড় দিচ্ছে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মেয়েকে নিয়ে অশ্লীল ছবি তৈরি ও প্রচারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ পর্যন্ত হয়েছে; যা সমাজে বিভাজন ও সহিংসতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। সম্প্রতি জাইমা রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট ও পরবর্তীতে গ্রেফতার -এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয় পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ।
“ঝড় আসলে পীরের গায়েও লাগে!” প্রবাদটির সত্যতা যেন দেখতে পাচ্ছি আমরা। এই নোংরামির শিকার আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানও। প্রধানমন্ত্রীর পরিবারও রেহাই পায়নি এই চক্রের হাত থেকে। এই অপসংস্কৃতি সমাজকে নোংরামির চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এখনই এদের বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে কেউই রক্ষা পাবে না।
এর আগে দেখেছি অরাজনৈতিক আন্দোলন হেযবুত তওহীদের শীর্ষ নেতা এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে গুজব ও প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে উত্তেজিত করে হামলার জন্য উস্কে দিতে। কিছুদিন আগে বরিশাল বিএম কলেজে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে হেযবুত তওহীদের দুই সদস্যকে মারধর এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্লেমগেম দেওয়া হয়েছে। তারও কয়েকদিন আগে গাজীপুরের কাপাশিয়ায় অনলাইন-অফলাইনে গুজব ছড়িয়ে হেযবুত তওহীদের সদস্যদের বাড়িঘরে হামলার পরিকল্পনা করা হয়।
গতকাল দেখলাম ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীর নাম ভাঙিয়ে যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রির অভিযোগে কয়েকজন যুবককের গ্রেফতার করতে।
রাষ্ট্রপ্রধান, তার পরিবার, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কিংবা সেলিব্রেটিদের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসনকে কিছু কিছু পদক্ষেপ তৎক্ষণাত নিতে দেখা যায় বটে। তবে এটা কি যথেষ্ট? সাধারণ মানুষের সম্মান রক্ষার দায়িত্বও তো সরকারের। যে আইনের শাসন সরকারের ঊধ্র্বতন কর্তৃপক্ষ ভোগ করছে সেটা সমভাবে ভোগ করার অধিকার প্রতিটি জনগণেরও। অথচ সাধারণ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ তারা থানায় গিয়ে এসব বিষয়ের প্রতিকার চাইলে পুলিশ এমন আচরণ করেন যে, এটা খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। এই আচরণই এই নোংরা সংস্কৃতি বিস্তারে সহযোগিতা করেছে। অথচ ঐ প্রশাসনের কোনো লোকের পরিবারের সাথে এমন ঘটনা ঘটলে নিশ্চয়ই তারা তৎপর হয়ে এর প্রতিকারে নামতেন। এই বৈষম্য মানুষ দেখতে চায় না।
নারীদের বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং, এক নীরব ট্র্যাজেডি
গুজবের সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছেন নারীরা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো নারীর ব্যক্তিগত ছবি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগ্রহ করে তা বিকৃত করা হচ্ছে। এরপর তার নামে ভুয়া সম্পর্ক, কেলেঙ্কারি বা অশ্লীল কনটেন্ট জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, একজন কলেজছাত্রীর ছবি নিয়ে এআই দিয়ে আপত্তিকর ভিডিও বানিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ভাইরাল। পরিবারে চাপ, সামাজিক অপমান, শেষ পর্যন্ত মেয়েটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ল। অনেক ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি আত্মহত্যার ঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি করছে। এই ধরনের অপরাধ শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়।
পরিসংখ্যান বলছে- ২০২৪ সালে ৫৯% নারী সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছেন। দুঃখের বিষয় হলো, অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি ৬৫% নারী।
এই গুজবের পরিণতি অনেকসময় গিয়ে ঠেকছে সহিংসতায়। অনলাইনে ছড়ানো গুজব বহু ক্ষেত্রে সরাসরি সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ভুয়া অভিযোগ বা ধর্মীয় উস্কানি ছড়িয়ে মব তৈরি করা হয়েছে, হামলা, লুটপাট, এমনকি হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে। এর পরিমাণ নিছক কম নয়, শত শত ঘটনা ঘটেছে গত ২০ মাসে।
আইনের দুর্বলতা ও ভুক্তভোগীদের অসহায়ত্ব
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- আইনের দুর্বল প্রয়োগ। অপরাধীরা প্রায়শই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ভুক্তভোগীরা অসহায়। লজ্জা, সামাজিক চাপ ও বিচারহীনতার কারণে তারা মুখ খুলতে পারেন না। নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা তাদের হাতে নেই। যদিও মাঝে মাঝে আলোচিত কিছু ঘটনায় ফ্যাক্ট-চেকাররা সক্রিয় হন, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য তেমন কোনো সহায়তা নেই।
গুজব ছড়ানোর কৌশল:
বর্তমানে গুজব ছড়ানোর কৌশলগুলো অত্যন্ত পরিকল্পিত ও প্রযুক্তিনির্ভর:
- ভুয়া ফটোকার্ড: কোনো ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে তার নামে মিথ্যা উক্তি (কোট) ছড়িয়ে দেওয়া।
- বেনামি লিফলেট ও পোস্টার: ধর্মীয় বা আবেগী ভাষা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো।
- ডিপফেইক ও এআই কনটেন্ট: প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করে ভাইরাল করা।
- মিডিয়া ব্র্যান্ড নকল করা: জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমের লোগো ও ডিজাইন কপি করে বিভ্রান্তিকর সংবাদ তৈরি।
- বট ও ফেক আইডি নেটওয়ার্ক: সংগঠিতভাবে হাজারো ভুয়া আইডি দিয়ে একই অপপ্রচার ছড়িয়ে জনমত প্রভাবিত করা।
- ক্লিকবেইট শিরোনাম: আংশিক সত্য বা পুরোপুরি মিথ্যা তথ্য দিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম তৈরি করে দ্রুত ছড়ানো।
গুজব রটনাকারীদের লক্ষ ও উদ্দেশ্য:
- ধর্মীয় ফ্যাসিস্টরা ভিন্নমতাদর্শের লোকদের হেয় করে তাদের উপর হামলার প্লট তৈরি।
- নির্বাচনী প্রতিপক্ষকে হেয় করা ও সম্মানহানি ঘটানো।
- ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে হীন স্বার্থ হাসিল করা।
- মব তৈরি করে সহিংসতা উসকে দিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা।
- অপতথ্য ছড়িয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করে ভোট বাগিয়ে নেওয়া।
- ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে একঘরে করা।
সময় গেলে সাধন হয় না:
এখনো সময় যায়নি হয়ত। এ ব্যাপারে সরকারকে এই মুহূর্তে হুঁশিয়ার হতে হবে। কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে এই মহামারী আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। এখনই প্রয়োজন কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ:
- জিরো টলারেন্স নীতি: গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ।
- সাইবার গোয়েন্দা জোরদার: সংগঠিত গুজবচক্র শনাক্ত ও গ্রেফতার।
- ফেক আইডি নিয়ন্ত্রণ: ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও পেজ দ্রুত শনাক্ত ও বন্ধ করা।
- শেয়ারকারীদের জবাবদিহি: যাচাই-বাছাই ব্যতীত ছাড়া ভুয়া তথ্য শেয়ারকারীদেরও আইনের আওতায় আনা।
- ফ্যাক্ট-চেক প্ল্যাটফর্ম: সাধারণ মানুষের জন্য সহজ অভিযোগ ও যাচাই ব্যবস্থা।
- সচেতনতা বৃদ্ধি: ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানো, যাতে মানুষ গুজব ও সত্য সংবাদের পার্থক্য বুঝতে পারে।