


আজ ২৫ বৈশাখ। বাঙালির সংস্কৃতি, সাহিত্য ও চেতনার অন্যতম আলোকবর্তিকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই মহান স্রষ্টাকে স্মরণ করতে দেশজুড়ে আয়োজন করা হয়েছে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও রবীন্দ্রসংগীতের আসর। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হচ্ছে নোবেলজয়ী এই কবিকে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবি নন, তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, সুরকার, নাট্যকার, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও চিত্রশিল্পী। বাংলা সাহিত্যকে আধুনিক রূপ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি বাঙালির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন। তার সৃষ্টি আজও কোটি মানুষের অনুভূতি, প্রেম, দেশপ্রেম ও মানবতার উৎস হয়ে আছে।
১৮৬১ সালের ২৫ বৈশাখ কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তার। অল্প বয়সেই কবিতা লেখা শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে একের পর এক কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়।
তার লেখা ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন রবীন্দ্রনাথ। এর মাধ্যমে প্রথম কোনো এশীয় হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে সর্বোচ্চ এই স্বীকৃতি পান তিনি। সেই অর্জনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাও বিশ্বদরবারে নতুন মর্যাদা লাভ করে।
রবীন্দ্রনাথের রচিত দুইটি গান আজ দুই দেশের জাতীয় সংগীত। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ এবং ভারতের জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’- দুটিই তার অমর সৃষ্টি। তার গান ও কবিতায় উঠে এসেছে প্রকৃতি, প্রেম, মানবতা, স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী।
সাহিত্যের বাইরেও শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন কবিগুরু। পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে প্রকৃতিনির্ভর ও মানবিক শিক্ষার এক নতুন ধারা চালু করেছিলেন। একইসঙ্গে তৎকালীন বাংলার কৃষক সমাজের উন্নয়ন নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর এবং নওগাঁর পতিসরে জমিদারি তদারকির সময় কৃষকদের জীবনযাত্রা উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
এবারের রবীন্দ্রজয়ন্তীর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ”। এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনা ও আবৃত্তির আসর।
কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়ি, শাহজাদপুরের রবীন্দ্র কাছারিবাড়ি এবং পতিসরে দিনব্যাপী আয়োজন করা হয়েছে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা। সেখানে অংশ নিচ্ছেন দেশবরেণ্য শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। কবির স্মৃতিবিজড়িত এসব স্থানে দর্শনার্থীদের ভিড়ও চোখে পড়ার মতো।
রাজধানী ঢাকাতেও রয়েছে নানা আয়োজন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হয়েছে চার দিনের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। এতে থাকছে রবীন্দ্রসংগীত, নৃত্যনাট্য, কবিতা আবৃত্তি ও আলোচনা অনুষ্ঠান। এছাড়া সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট আয়োজন করেছে দুই দিনের রবীন্দ্র উৎসব। সেখানে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন দেশের খ্যাতিমান রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীরাও।
বাংলা একাডেমিও আয়োজন করেছে বিশেষ সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানও নিজেদের আয়োজনে স্মরণ করছে বিশ্বকবিকে।
দেড় শতাব্দী পেরিয়েও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজও বাঙালির হৃদয়ে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তার সাহিত্য, দর্শন ও সংগীত মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে সৌন্দর্যবোধ, মানবতা, ভালোবাসা ও দেশপ্রেম। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি এখনো মানুষের জীবন ও চিন্তায় অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।