


এম আর হাসান:
খুররম খান পন্নী ছিলেন উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসের এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান পর্ব এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ- এই তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি টাঙ্গাইলের করটিয়ার ঐতিহ্যবাহী পন্নী পরিবারের সদস্য ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, তিনি ছিলেন পন্নী পরিবারের (বড় তরফ) শেষ জমিদার। এই পরিবার মূলত আফগানিস্তান থেকে আগত পশতু ‘কররানি’ গোত্রভুক্ত, যারা সুলতানি যুগে স্বাধীন বাংলার সুলতান ছিলেন (১৫৬৩-১৫৭৬)। পরবর্তীতে তারা ‘পন্নী’ পরিচয় স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হন। তিনি ছিলেন করটিয়ার সমাজ সংস্কারক ও জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর জ্যেষ্ঠ পৌত্র এবং মাসুদ আলী খান পন্নীর জ্যেষ্ঠ পুত্র। পারিবারিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ তাঁর চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে শৈশব থেকেই গভীর প্রভাব ফেলে।
তিনি দার্জিলিংয়ের সেন্ট পলস স্কুল, কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন। সে সময় এই প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল উপমহাদেশের অভিজাত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন শিক্ষার্থীদের অন্যতম কেন্দ্র, যা তাঁর নেতৃত্বগুণ ও রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু থেকেই ছিল জটিল ও ঘটনাবহুল। ১৯৪২ সালে তিনি বেঙ্গল অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন, তবে তখনই তাঁর বয়স নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাঁর ম্যাট্রিকুলেশন সার্টিফিকেট অনুযায়ী জন্মসাল ছিল ১৯২০। ধারণা করা হয়, অল্প বয়সে পরীক্ষা দেওয়ার কারণে বয়স বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর বয়স নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তাঁর বাবার পাঠানো একটি টেলিগ্রামকে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়, যেখানে লেখা ছিল- ঝড়হ নড়ৎহ, নড়ঃয সড়ঃযবৎ ধহফ পযরষফ বিষষ এবং সেই টেলিগ্রামের তারিখ ছিল নভেম্বর ১৯২১। এই প্রমাণের ভিত্তিতে তিনি নির্বাচিত হয়েও সদস্যপদ হারান। পরবর্তীতে উপনির্বাচনের মাধ্যমে তিনি আবার নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পান এবং সেই আসনে পুনরায় জয়ী হন।
এরপর ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী ছিলেন করটিয়ার জমিদার খুররম খান পন্নী। তিনি ছিলেন একজন নিপাট প্রজাপ্রিয় ভদ্রলোক। প্রজা নিপীড়ন বা নির্যাতনের কোনো অভিযোগ ছিল না তার নামে। আবার আচরণে নিখুঁত বিনয়ী। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক কোনো বিবেচনাযোগ্য প্রার্থী ছিলেন না। খুররম খান পন্নী তার নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতা করার জন্য মাইক নিয়ে এসেছিলেন। টাঙ্গাইলের মানুষ এর আগে কখনো মাইক দেখেনি। একজন মানুষ কথা বললে তাকে শতগুণ মণ্ডিত হয়ে দূরের মানুষের কাছেও পৌঁছায়, তা এই প্রথম দেখল তারা।
করটিয়া সাদাত কলেজের মাঠে সেই সভায় হাজার মানুষের ভিড়। মাঠের এক কোনায় বসেছিলেন শামসুল হক। জমিদার সাহেবের কথা শেষ হওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে গেলেন মঞ্চের ওপর। জমিদার পন্নীকে বললেন, হুজুর এই নির্বাচনে আমিও একজন প্রার্থী। কিন্তু আমি আপনার মতো মাইক পাব কোথায়? যদি আমাকে অনুমতি দেন তাহলে এই মাইকে আমি আমার নিজের দুটি কথা বলতে পারি। আমি একটু আগেও বলেছি খুররম খান পন্নী একজন উদারপন্থী লোক ছিলেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। কেন নয়। দাও, বক্তব্য দাও। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিজের আয়োজিত জনসভায় মাইকে বক্তব্যের সুযোগ দিয়ে অনন্য নজির স্থাপন করে গেছেন।
শামসুল হক একজন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। লেখাপড়া জানতেন। ইংরেজি বাংলা উভয় ভাষায় লিখতে এবং বলতে পারদর্শী ছিলেন। নিজেই নিজের দলের ম্যানিফেস্টো লিখেছিলেন এবং খুব ভালো বক্তৃতাও করতে পারতেন। মাইক নিয়ে তিনি প্রথমেই ভূয়সী প্রশংসা করলেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী খুররম খান পন্নীর। কৃতজ্ঞতা জানালেন প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া সত্ত্বেও তার মতো একজন সাধারণ মানুষকে জমিদার সাহেব মাইক ব্যবহার করতে দিয়েছেন তার জন্য। তারপর তার মূল কথায় এলেন। শামসুল হক বললেন, জমিদার খুররম খান পন্নীর বিরুদ্ধে আমি প্রার্থী নই। তার মতো ভালো মানুষের বিরুদ্ধে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আমার লড়াই মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে। আমি মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছি।
১৯৬২ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরে চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর মাধ্যমে তিনি পুনরায় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রে ফিরে আসেন। ১৯৬৩ সালে তাঁর জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি কূটনৈতিক দায়িত্বে প্রবেশ করেন। তিনি পূর্বপাকিস্তানের স্বার্থরক্ষায় তৎপর থাকায় কেন্দ্রীয় সরকার তাকে চিফ হুইপ থাকা অবস্থায় পূর্ব আফ্রিকায় পাকিস্তানের কমিশনারের (রাষ্ট্রদূত) দায়িত্ব দিয়ে দেশ থেকে দূরে রাখেন। পরবর্তীতে কেনিয়া, উগান্ডা, টাঙ্গানিকা ও জাঞ্জিবার অঞ্চলে হাই কমিশনার হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি আর্জেন্টিনা ও ফিলিপাইনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তখন তিনি ফিলিপাইনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হলে তিনি এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের প্রথম কূটনীতিক, যিনি প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। ম্যানিলায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানি সামরিক শাসককে অবৈধ, জনবিচ্ছিন্ন এবং মানবতাবিরোধী বলে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি জাকার্তায় বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল, এবং এই প্রক্রিয়ায় তাঁর কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে তিনি সক্রিয় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জীবন থেকে সরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেন।
তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও উল্লেখযোগ্য। তাঁর পুত্র ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (২য়) বাংলাদেশে সংসদ সদস্য ছিলেন, সরকারের উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং রাষ্ট্রদূত হিসেবেও কূটনৈতিক দায়িত্বে যুক্ত ছিলেন। আর তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মোর্শেদ আলী খান পন্নীও দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
খুররম খান পন্নীর কর্মময় জীবন যেন এক পরিবর্তনশীল সময়ের প্রতিচ্ছবি। অভিজাত পন্নী পরিবারের সন্তান হিসাবে রাজনীতি, প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা হিসেবে বিবেচিত হয় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি তাঁর প্রকাশ্য সমর্থন, যা তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিশেষ অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে।