


হাসান মাহ্দী:
একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ অধ্যায়টি হলো ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার বহুমুখী সংঘাত। এই সংঘাত কেবল দুটি রাষ্ট্র বা জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে এক সময়ের অপরাজেয় মুসলিম জাতির উত্থান-পতন, বর্তমানের বিভক্তি এবং আগামীর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রশ্ন। এই জটিল সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হচ্ছে- এক সময়ে বিশ্বকে লিড দেওয়া বীর জাতি মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তারা কি আবার সেই পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারবে? যদি সেই অবস্থায় ফিরে যেতে হয় তাহলে সবার আগে প্রয়োজন মুসলিম বিশ্বের ঐক্য।
মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রশ্নের পেছনে আছে আরো একটি বড় প্রশ্ন, ‘কীভাবে’? ইসলামের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ যারা জানেন, তারা একমত হবেন যে এমন এক সময় ছিল যখন মুসলিম উম্মাহ জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দিক্ষা, সামরিক শক্তিতে ছিল বিশ্বের টপ। পৃথিবীকে তারা নেতৃত্ব দিয়েছে। আব্বাসীয় খেলাফত থেকে শুরু করে আন্দালুসিয়ার মুসলিম শাসনামল পর্যন্ত, তারা যা অর্জন করেছিল তা তৎকালীন বিশ্বের জন্য ছিল বিস্ময়কর। তবে গত কয়েকশ বছরের চিত্রটি অত্যন্ত করুণ। আজ যে মুসলিম জাতিকে আমরা দেখছি, তারা হাজারো ভাগে বিভক্ত। যে ধর্ম হওয়ার কথা ছিল ঐক্যের মূলমন্ত্র, সেই ধর্মকেই ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতা এবং সম্পদশালী হওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অন্ধত্ব, কুসংস্কার এবং হীনম্মন্যতা আজ এই জাতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে তারা নিজেদের সমস্যার সমাধান তো দূরে থাক, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষাতেও অন্যের মুখাপেক্ষী।
ইরানের ওপর বর্তমান যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞাগুলো চাপিয়ে দেওয়া সঙ্কট। মজার বিষয় হলো, আজ আমেরিকা যে ইরানের নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি ধ্বংস করতে মরিয়া, সেই আমেরিকাই এক সময় ইরানের পাপেট সরকারকে এই প্রযুক্তি দিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর যখন ইরান আমেরিকার প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে এল এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াল, তখনই তারা আমেরিকার প্রধান শত্রুতে পরিণত হলো।
আমেরিকা কেন এখন ইরানকে ধ্বংস করতে চায়? এর কারণ কেবল নিরাপত্তা নয়, বরং ‘স্বার্থ’। ইরান একটি বিশাল জ্বালানি সম্পদশালী রাষ্ট্র, যা বর্তমানে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে নেই। এছাড়া ইরান যেভাবে আমেরিকার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস দেখাচ্ছে, তা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে।
বর্তমান যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ইরানের প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত রহস্যময় এবং অনেক ক্ষেত্রে হতাশাজনক। সবাই নিজেদের শাসন আর গদি টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত। ধর্মীয় ভ্রাতৃত্বের চেয়ে এখন ‘জাতিরাষ্ট্র’ (Nation-state) বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ মুসলিম দেশ আজ ইসরায়েল বা আমেরিকার ভয়ে তটস্থ, যেখানে ইরান একা লড়ে যাচ্ছে। ৫৭টি মুসলিম দেশের হাতে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তারা কেন অবলা হয়ে আছে? উত্তরটি হলো- ‘বিভক্তি-ঐক্যহীনতা’। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বিতর্ক। খাওয়া, ঘুম থেকে শুরু করে ইবাদত ও উৎসব পালন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আর দ্বন্দ্ব করে আমরা নিজেরা দুর্বল হয়েছি। যার সুবিধা নিয়ে বিশ্বে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কয়েকটি পরাশক্তি। তারাই এখন মুসলিম জাতির উপর খড়গহস্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই বৈঠক ভেস্তেও যায়। যদিও আবারও বৈঠকে বসার কথা শোনা যাচ্ছে। আমি মনে করি, এটি একটি অত্যন্ত জটিল কৌশল। পাকিস্তান তার ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
একদিকে তারা বলছে যে, মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য। অন্যদিকে, সমালোচকরা মনে করেন এটি আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর একটি কৌশল মাত্র। কারণ, গত মাসেই পাকিস্তান তাদের প্রতিবেশী দেশের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তারা আফগানিস্তানের একটি হাসপাতালে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক তোপের মুখে পড়েছিল। বর্তমান পাকিস্তান মূলত এই যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতার মাধ্যমে তাদের হারানো ইমেজ ফিরে পেতে চাইছে। তবে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক পলিসি সম্পর্কে যারা ধারণা রাখেন, তারা জানেন যে পাক সেনাবাহিনী আসলে কাদের চাওয়া বাস্তবায়ন করে। খোদ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক; অর্থনৈতিক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিক থেকে তারা অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
এই যুদ্ধবিরতির পেছনে থাকা বৃহৎ শক্তিগুলোর উদ্দেশ্যও ভিন্ন। আমেরিকা এই সময়টুকুকে ব্যবহার করছে ইসরায়েলকে পুনর্গঠিত করার এবং ইরানের ওপর বহুমুখী চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে। অন্যদিকে ইরান এই সময়কে তাদের কূটনৈতিক অবস্থান মজবুত করতে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে সমন্বয় করতে কাজে লাগাচ্ছে। তাই এই যুদ্ধবিরতি ততক্ষণ পর্যন্ত সফল হবে না যতক্ষণ না বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা থেকে সরে আসে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয় বরং বৃহত্তর কোনো ধ্বংসযজ্ঞের আগের একটি সাময়িক বিরতি মাত্র।
ইরান যেভাবে একা লড়ছে, তাতে তাদের কারো না কারো বড় সহযোগিতা লাগবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীন বা রাশিয়া যদি ইরানের পাশে দাঁড়ায় এবং যুদ্ধে ইরান একটি ভালো অবস্থান পায়, তবে সেখানে এক নতুন বিপত্তি তৈরি হবে। চীন বা রাশিয়া কেউই নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করবে না। আপনি যদি পশ্চিমের গোলামি থেকে বাঁচতে গিয়ে চীনের শর্তযুক্ত সহযোগিতা গ্রহণ করেন, তবে তা মুসলিম জাতির প্রকৃত স্বাধীনতা আনবে না। এটি কেবল এক পরাশক্তির অধীনতা থেকে অন্য পরাশক্তির অধীনতায় স্থানান্তরের নামান্তর।
হরমুজ প্রণালী বর্তমানে আমেরিকার জন্য মাথাব্যথার কারণ। বিশ্বের তেলের এক বিশাল অংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। আমেরিকা পরিকল্পনা করছে এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরানকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করতে। পাল্টা জবাবে ইরান বলেছে, তাদের সার্বভৌমত্ব ছাড়া এখানে কারো আধিপত্য চলবে না। যদি এই পথ বন্ধ করে রাখা হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে এবং যার প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশগুলোর ওপর সাবার আগে পড়বে।
এখন এইরকম পরিস্থিতিতে মুসলিম উম্মাহকে যদি আবার মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে হয়, তবে মৌলিক জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। ছোটখাটো ধর্মীয় বিভেদগুলো ভুলে গিয়ে ‘এক আল্লাহ, এক নবী এবং এক নীতি’র ভিত্তিতে শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে।
সাদ্দাম হোসেন বা গাদ্দাফির মতো বড় নেতারাও এই পশ্চিমা অপশক্তির কাছে টিকতে পারেনি। ইরানের অবস্থাও তেমন হবে যদি না পুরো মুসলিম বিশ্ব জেগে ওঠে। পরাশক্তি হওয়া মানে কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং নীতি-আদর্শ ও শৃঙ্খলার শীর্ষে আরোহণ করা। ইরান আজ একাকী প্রতিরোধের যে নজির স্থাপন করেছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি মুসলিম জাতি এক হতে পারে, তবেই এই অপশক্তির হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। অন্যথায়, আমরা কেবল এক গোলামি থেকে অন্য গোলামির চক্রে ঘুরতে থাকবো। [লেখক: কলামিস্ট]