


দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন অবিসংবাদিত নেত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জীবদ্দশায় সবসময় দেশবাসীর উদ্দেশে বলতেন, “এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। বিদেশে আমার আর কোনো ঠিকানা নেই। আমি কোথাও যাব না।” অবশেষে তিনি নিজের দেশের মাটিতে, সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়, প্রিয় স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি বীর-উত্তম জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরশান্তি লাভ করেন।
জ্যেষ্ঠপুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজ হাতে মমতাময়ী মায়ের কফিন কবরে নামান এবং পরবর্তীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় এই মহীয়সী নেত্রীকে, যিনি অন্যায়ের সামনে কখনো আপস করেননি। সমগ্র জাতি গতকাল হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়েছে খালেদা জিয়াকে। ঢাকা মহানগরীর রাস্তাগুলো যেন একদিনের জন্য মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে মিলিত হয়ে যায়।
কয়েক দিনের কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার পর জানাজার দিন দুপুরে সূর্যের উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ে। দুপুর ৩টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক মহান আল্লাহর নামে চার তাকবিরে জানাজার নামাজ শেষ করেন। এরপর লাশবাহী গাড়িতে করে দেশনেত্রীর লাশ সংসদ ভবন থেকে জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়। বিকাল পৌনে ৫টার দিকে শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয় তাঁকে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। সারা দেশে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং সাধারণ মানুষ কালো ব্যাজ পরিধান করেন। এই উপলক্ষে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয় ইতিহাসের বৃহত্তম জনতার জানাজার নামাজ। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে স্থান নির্ধারণ করা হলেও উপস্থিত মানুষ জনসংখ্যার কারণে আশপাশের লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, বাণিজ্য মেলার মাঠ, আগারগাঁও স্কুল-কলেজের মাঠ, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ধানমন্ডি ও কলাবাগান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সরাসরি জানাজায় অংশ নেন। জনসমুদ্রে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান দেখা যায়নি; বরং মানুষ মুখে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’সহ কলমা শাহাদাত উচ্চারণ করেন।
জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন তারেক রহমান। ইসলামি রীতিনীতির অনুসারে তিনি মায়ের জন্য সবাইকে দোয়া চেয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে এটিই সর্ববৃহৎ জানাজার নামাজ, যা ১৯৮১ সালের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজার আকারকেও ছাড়িয়ে যায়। সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্যরা কফিন কাঁধে বহন করেন।
জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিনবাহী ফ্রিজিং ভ্যান সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আসে দুপুর ১২টার পর। সকাল ৯টা ১৭ মিনিটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে লাশ বহনকারী গাড়িটি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে তারেক রহমানের বাসায় পৌঁছায়। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, বিজয় সরণি, আগারগাঁও, খামারবাড়ি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ ও মোহাম্মদপুরে বিপুল জনতার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
জানাজায় ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৩২টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। নিরাপত্তার দায়িত্বে বিজিবি, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনী মোতায়েন ছিলেন।
খালেদা জিয়ার কফিনের পাশে বসে তারেক রহমান কোরআন তিলাওয়াত করেন। তিনি জানাজার আগে জনগণের উদ্দেশে বলেন, “দোয়া করবেন আল্লাহতায়ালা যেন মাকে বেহেশত দান করেন।” বিএনপির সিনিয়র নেতারা, ইসলামি স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দও জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।
শেষ সময়ে খালেদা জিয়ার জীবন হাসপাতালের চিকিৎসা ঘিরে কেটেছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে দীর্ঘদিন সিসিইউতে থাকার পর গত মঙ্গলবার সকাল ৬টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিন লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস ও চোখের সমস্যায় ভুগে জীবনের শেষ সময়টা হাসপাতালে কাটান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নির্বাহী আদেশে কারামুক্তি পান এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের লন্ডনে পাঠানো হয়। ১১৭ দিন চিকিৎসার পর দেশে ফেরার পর একাধিকবার শারীরিক জটিলতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হন।
অবশেষে বাংলাদেশের রাজনীতির এক আপসহীন মহীয়সী নেত্রী, বেগম খালেদা জিয়া, সমগ্র জাতির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।