


বগুড়া প্রতিনিধি:
ঈদের খুশিতে যখন চারদিক মুখর, তখন ঠিক তার উল্টো চিত্র বগুড়ার শ্রমবাজারে। পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতে ঈদের পরদিনই কাজের সন্ধানে রাজপথে নেমেছেন শত শত শ্রমজীবী মানুষ। ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে আসা এই মানুষদের জীবনে ঈদ মানেই শুধু বেঁচে থাকার নিরন্তর এক লড়াই।
বগুড়া শহরের নামাজগড় মোড়ে প্রতিদিন সকালে বসে এই শ্রমের বাজার। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন আদিম যুগের সেই দাসপ্রথা আবার ফিরে এসেছে, যেখানে মানুষ বিক্রি হতো। তবে পার্থক্য শুধু এই আধুনিক যুগে মানুষগুলো নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে আসে। সারাদিনের জন্য এই শ্রমজীবীরা মালিকপক্ষের গৃহ নির্মাণসহ গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজ করে থাকেন।
সারা দেশে যখন উৎসবের আমেজ, নামাজগড় মোড়ে তখন কেবলই টিকে থাকার এক জীবনযুদ্ধ। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন শত শত মানুষ। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে ঝুড়ি- অপেক্ষা শুধু একজন মহাজনের।
প্রতিদিনই এই বাজারে কাজের সন্ধানে আসেন হাজারেরও বেশি মানুষ। এদের অধিকাংশই আবার বয়োবৃদ্ধ। ঘর থেকে ২০-২৫ কিলোমিটার দূর থেকে কাজের আশায় ছুটে আসেন তাঁরা। পকেটে থাকা সামান্য কিছু টাকা থেকেই যাতায়াত খরচ হয়ে যায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা। দিনশেষে ৫০০ বা ৮০০ টাকায় নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে পারলেই যেন সার্থক তাদের এই দীর্ঘ অপেক্ষা।
কাজের অপেক্ষায় থাকা এক বৃদ্ধ শ্রমিক বলেন, "বাবা, ঈদ আসুক আর না আসুক, পেট তো আর ঈদ বোঝে না। ঘরে চাল নাই, তাই ভোরেই চলে আসছি। যদি কেউ কাজে নেয়, তবেই আজ চুলা জ্বলবে।"
এই মানুষগুলোর কাছে ঈদের আনন্দ যেন এক বিশাল বিলাসিতা। বাড়ির ছোট ছোট সন্তানদের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে পারাই তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় উৎসব। যাতায়াতের কষ্ট কিংবা রোদে পোড়ার যন্ত্রণা থাকলেও, তাঁদের নেই কোনো অভিযোগ। তাঁদের চোখেমুখে শুধু একটাই আকুতি একটি কাজের সন্ধান।
আরেকজন বৃদ্ধ শ্রমিক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, "গাড়ি ভাড়া দিয়ে আসছি অনেক দূর থেকে। কাজ না পাইলে লস। সারাদিন বসে থাকি, কেউ ডাক দিলে জানটা বাঁচে।"
বগুড়ার এই শ্রমবাজার যেন এক জীবন্ত উপাখ্যান। যেখানে ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের কাছে ম্লান হয়ে যায় উৎসবের সব রং। এই মানুষগুলোর নিরন্তর লড়াই আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়- পৃথিবীর এক পিঠে যখন আনন্দ, অন্য পিঠে তখন কেবলই বেঁচে থাকার সংগ্রাম।