


বিশ্বের চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম এক প্রাণী হলো ‘রাজকাঁকড়া’, বা ইংরেজিতে ‘হর্সশু ক্র্যাব’। দীর্ঘকাল ধরে পৃথিবীর জীবাশ্মের মতো টিকে থাকা এই জলজ প্রাণীর রক্ত বর্তমানে এতটাই মূল্যবান যে, এক লিটার রক্তের দাম ১৫ লাখ টাকারও বেশি। এর বিশেষত্ব ও rarity-এর কারণে রাজকাঁকড়ার রক্তকে অন্য কোনও প্রাণীর রক্তের সঙ্গে তুলনা করা যায় না।
রাজকাঁকড়া মূলত কাঁকড়াবিছা এবং মাকড়সার সঙ্গে নিকটাত্মীয়। তাদের গায়ের খোলস ঘোড়ার খুরের মতো শক্ত ও উপবৃত্তাকার। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই প্রাণী প্রায় ৩৬০ মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীতে প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় টিকে আছে। ডাইনোসরের যুগের অনেক আগে, আজ থেকে প্রায় ১০–১৫ কোটি বছর আগেও রাজকাঁকড়া পৃথিবীতে ছিল।
এই প্রাণীর অন্যতম বিশেষত্ব হলো তাদের ‘নীল রক্ত’। মানুষের রক্তে হিমোগ্লোবিন থাকে যা লৌহ উপাদান নিয়ে অক্সিজেন বহন করে, কিন্তু রাজকাঁকড়ার রক্তে হিমোসায়ানিন থাকে। হিমোসায়ানিনে লৌহের পরিবর্তে কপার থাকে, যার কারণে রক্তের রঙ নীল হয়। আরও বিশেষ ব্যাপার হলো, রাজকাঁকড়ার রক্তে থাকা অ্যামিবোসাইট কোষ ক্ষুদ্রতম ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুর উপস্থিতিতেই রক্তকে দ্রুত জমাটবদ্ধ করতে পারে। এই প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কারণে রাজকাঁকড়া শত শত কোটি বছর ধরে প্রাণঘাতী রোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে।
১৯৬০-এর দশকে মার্কিন গবেষক ফ্রেডরিক ব্যাং এবং জ্যাক লেভিন এই প্রাণীর রক্ত ব্যবহার করে আবিষ্কার করেন ‘লিমুলাস অ্যামিবোসাইট লাইসেট’ নামের পরীক্ষা পদ্ধতি। এটি ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু দূষণ পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। ১৯৭০-এর দশক থেকে এই পদ্ধতি চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইনজেকশন, ভ্যাকসিন, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম, কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ইত্যাদি জীবাণুমুক্ত কিনা তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। ফলে, রাজকাঁকড়ার রক্তের মাধ্যমে প্রতিদিন অগণিত মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ রাজকাঁকড়া ধরে তাদের রক্ত সংগ্রহ করা হয়। এর ফলে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’ এই প্রাণীকে ‘সংকটাপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। যদি বিকল্প প্রযুক্তি দ্রুত আবিষ্কার না করা হয়, তবে রাজকাঁকড়ার অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য বিরাট সংকট তৈরি করবে। তাই, মানবজাতির জীবনের রক্ষায় এই বিপুল অবদানের জন্য রাজকাঁকড়ার সুরক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।