Ultimate magazine theme for WordPress.

সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব

মোহাম্মদ আসাদ আলী

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে আমরা মুসলিম নামক জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এই দ্বন্দ্বের একপ্রান্তে রয়েছে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী ধর্মহীন সভ্যতা ও তার তৈরি আইন, কানুন, মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা; আরেকপ্রান্তে রয়েছে কুরআন-হাদিসভিত্তিক হারাম-হালাল ও ধর্মীয় মূল্যবোধ। মাঝখানে সঙ্কটে পড়েছি আমরা মুসলিম সমাজ। পাশ্চাত্যের কোনটা গ্রহণ করব আর কোনটা বর্জন করব, কতটুকু গ্রহণ করব আর কতটুকু বর্জন করব, এ নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত নেই আমাদের।
আমরা মুসলিমরা না পেরেছি নিজেদেরকে পাশ্চাত্যের ধর্মহীন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখতে, আবার না পেরেছি পাশ্চাত্যের শিক্ষা-দর্শন-সংস্কৃতিকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে নিতে। উপরন্তু পশ্চিমাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিপরীতে আমাদের নিজেদের বিশ্বাস ও মননের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কোনো নিজস্ব সাংস্কৃতিক কাঠামোও গড়ে তুলতে পারিনি আমরা। ফলে সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকেই আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও তর্ক-বিতর্কের মধ্যে পড়েছে বারবার। যেমন সঙ্গীতের কথা বলা যায়। এখনও আমাদের মুসলিম সমাজ গান হারাম নাকি হালাল সেটা নিয়ে তর্ক করে সমাধান বের করতে পারেনি।
সভ্যতা ও সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক। সাংস্কৃতিক চর্চা যেমন গান-বাদ্য-সাহিত্য-শিল্প ইত্যাদি বাদ দিলে কোনো সভ্যতাই পরিপূর্ণতা পায় না। পৃথিবীতে বহু সভ্যতার উত্থান পতনের ইতিহাস আমরা পাই। কিন্তু একটি সভ্যতাও পাই না যেখানে সঙ্গীত ছিল না, যেখানে সুরে ও ছন্দে মানুষের মন আন্দোলিত হত না। সেই সুর ও ছন্দের তালে তালে যখন মানবতার জয়গান গাওয়া হয়েছে, সেই সভ্যতার ভিত হয়েছে শক্তিশালী; আর যখন অন্যায় ও অসত্যের জয়গান গাওয়া হয়েছে, সেই সভ্যতা ততই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে এবং এক পর্যায়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশ্চাত্য সভ্যতা যেহেতু ধর্মহীনতার উপরে প্রতিষ্ঠিত, ভোগবাদের উপরে প্রতিষ্ঠিত, কাজেই তার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের গোড়াতেও যে ভোগ ও ইন্দ্রিয়সর্বস্বতাই মুখ্য ভূমিকা পালন করবে সেটাই স্বাভাবিক। ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি সংস্কৃতিচর্চার নামে অবাধে চলছে অপসংস্কৃতির প্রসার, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার দৌরাত্ম্য।
এই অশ্লীলতা ও অসত্যের আগ্রাসন যখন মুসলিম সমাজকে গ্রাস করতে উদ্যত হলো, তখনই শুরু হলো মুসলিমদের সাংস্কৃতিক জীবনের সংঘাত। দুঃখজনক বিষয় হলো, কয়েকশ’ বছরের এই সাংস্কৃতিক সংঘাত থেকে মুসলিম জাতি আজ অবধি মুক্তির কোনো পথ খুঁজে পায়নি। আরেকটু পরিষ্কার ভাষায় বললে, পথ খুঁজে পেতে দেয়নি তাদের ধর্মীয় নেতা বা পুরোহিত সমাজ। কবি বলেছেন, “দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি, সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?” দ্বার বন্ধ করে দিয়ে মিথ্যাকে রুখে দেওয়ার ভুল প্রক্রিয়াটিই বেছে নিয়েছেন আমাদের ধর্মীয় নেতারা। তারা পশ্চিমা অপসংস্কৃতিকে মোকাবেলা করতে গিয়ে সংস্কৃতিচর্চার পথকেই রুদ্ধ করে দিতে চেয়েছেন যা কেবল অপ্রাকৃতিকই নয়, বাড়াবাড়িও।
শত শত বছর ধরে তারা ফতোয়া দিয়ে আসছেন যে, গান হারাম, বাদ্য হারাম; এবং যেনতেন হারাম নয়, যেন গান শোনা কিংবা গান গাওয়ার চেয়ে বড় পাপ আর নেই। এটি যেন শূলে চড়ানোর মত মহাপাপ! সঙ্গীতচর্চার বিরুদ্ধে হাজার হাজার ফতোয়া দিয়ে, হাজার হাজার ওয়াজ করে ধর্মপ্রাণ মানুষের ধারণার মধ্যে এই কথাটি গেঁথে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানুষ তো কেবল দেহ নয়, আত্মাও। তার যেমন দেহের চাহিদা রয়েছে, তেমনি আত্মার খোরাক মেটানোর জন্য সুস্থ সংস্কৃতিরও প্রয়োজন আছে। কোকিল যখন ডাকে, যখন বাতাসের তাড়নায় শুকনো পাতার মর্মরধ্বনি জাগ্রত হয়, যখন সোনালী ধানের ক্ষেতে হিল্লোল ওঠে, যখন বৃষ্টির ধারা রুমঝুম নূপুরের লহরী তোলে, তখন সেই সুর, ছন্দ ও তাল অপার্থিব ভালোলাগায় মানুষের মন ভরিয়ে দেয়, পশুপাখির কী প্রতিক্রিয়া হয় তা গবেষকরা বলতে পারবেন। আমার প্রশ্ন হলো, যারা গান-বাদ্য ও সুর-ছন্দকে হারাম বলতে চান, তারা কি প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা সুর ও ছন্দকে উপভোগ করেন না?
একটি অস্ত্র দিয়ে ডাকাতি করা যায়, আবার ডাকাত নির্মূলও করা যায়। অস্ত্রটি কোন পথে ব্যবহৃত হবে তা নির্ভর করে ব্যবহারকারীর উপর। ঠিক তেমনি গান হতে পারে যাবতীয় অন্যায়, অসত্য ও স্থবিরতার বিরুদ্ধে বিপ্লবের হাতিয়ার। আবার গান হতে পারে অশ্লীলতা ও আল্লাহর নাফরমানী প্রসারের মাধ্যম। সঙ্গীতকে কোন কাজে ব্যবহার করবেন – সেটাই মুখ্য বিষয়। মাথা ব্যথা হলে যেমন মাথা কেটে ফেলা কোনো সমাধান নয় তেমনি অশ্লীল সঙ্গীতের কারণে সঙ্গীতকেই নকআউট করে দেয়ার কোন যৌক্তিকতা নেই।
আজকে আমরা যদি পবিত্র কোর’আনকে বিবেচনায় নিই, বলার অপেক্ষা রাখে না পবিত্র কোর’আন একটি উচ্চমার্গীয় কাব্যময় ঐশী গ্রন্থ। আল্লাহ কোরআনকে ছন্দময় করে নাজেল করেছেন। তাছাড়া পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য যে আজান দেওয়া হয়ে থাকে, সেটি কি সুর নয়? পৃথিবীর বহু দেশে আন্তর্জাতিক পরিসরে আজানের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। যিনি সবচাইতে নিখুঁত উচ্চারণে ও হৃদয়স্পর্শী সুরে আজান দিতে পারেন তিনি বিজয়ী হন। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় খেয়াল করুন- আমাদের ধর্মীয় নেতারা, ওয়াজের বক্তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা যেভাবে ওয়াজ-মাহফিলে বয়ান পেশ করেন, তারা যদি সুরেলা কণ্ঠে না বলে ভাষণ দেওয়ার ভঙ্গিতে কথা বলতেন তাহলে কি মানুষ রাত জেগে তাদের বয়ান শুনত? বস্তুত প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের একেবারে সাধারণ মানুষ যারা হয়ত ওয়াজের বক্তব্যগুলো ঠিকমত বোঝেনও না, কিন্তু সারারাত জেগে জেগে ওয়াজ শোনেন- এর পেছনে দু’টি কারণ রয়েছে। একটি কারণ হলো সওয়াবের চিন্তা, আত্মিক পরিতুষ্টি অর্জন; আর দ্বিতীয় কারণ হলো- ওয়াজের বক্তারা কথা বলেন সুরেলা কণ্ঠে, যা সঙ্গীতের মতই চিত্তকে প্রশান্ত করে। এজন্যই মূলত যিনি যত সুন্দর সুরেলা কণ্ঠে ওয়াজ করতে পারেন ওয়াজের বাজারে তার খ্যাতি ও দরও তত বেশি হয়ে থাকে। তার মানে ওয়াজিয়ানগণও সঙ্গীতকে বর্জন করতে পারছেন না। প্রকৃতপক্ষে সঙ্গীতকে বর্জন করা আদতে সম্ভব হচ্ছে না, তাহলে কেন এই অযৌক্তিক ও অপ্রাকৃতিক ফতোয়াবাজি?
ফতোয়াবাজির পরিণতি হয়েছে এই যে, আমরা আজ হারাম আর হালালের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আক্রান্ত। আমরা এখন এই দ্বন্দ্বের মধ্যে আছি কোনটা ধরব আর কোনটা ধরব না, কোনটা নেব কোনটা নেব না, কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ। এ দ্বন্দ্ব অতি মারাত্মক। দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকেই আসে জড়তা, আড়ষ্টতা, স্থবিরতা। এটাই অজ্ঞতা, এটাই জাহেলিয়াত। যখনই কোনো একটি জাতি দ্বিধার মধ্যে পড়ে যে, কোনটা করবে আর কোনটা করবে না, কোনটা উচিত হবে আর কোনটা উচিত হবে না, কোনটার অনুমতি আছে আর কোনটায় নিষেধাজ্ঞা- তার মানে ওই জাতি অজ্ঞতার মধ্যে পড়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মত জ্ঞান তাদের নেই। এই দ্বন্দ্বে ভোগা সমাজ, দ্বন্দ্বে ভোগা জনগোষ্ঠী কোনোদিন সভ্যজাতির স্থান দখল করতে পারে না। তারা কোনোদিন সভ্যতার চূড়ান্ত শিখরে উঠতে পারে না। তাদের এই আড়ষ্টতা, এই স্থবিরতা, এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারাগার ভেঙে বের করে আনার জন্যই যুগে যুগে নবী-রসুলগণ এসেছেন, যাদের দ্বারা বিপ্লব হয়েছে, রেনেসাঁ হয়েছে। দুর্ভাগ্য আমাদের যে, আখেরী নবী, বিশ্বনবী মোহাম্মদ (সা.) আইয়ামে জাহেলিয়াতের তলদেশ থেকে মুক্ত করে আমাদেরকে যেই সেরা জাতি বানিয়ে গেলেন, সেখান থেকে অধঃপতিত হয়ে আজকে আমরা গোলাম জাতি হয়েছি। আমরা যখন সেরা জাতি ছিলাম, তখন আমরাই ছিলাম পৃথিবীর চালকের আসনে। পৃথিবীতে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে নাকি অপসংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে সেটার সিদ্ধান্ত ছিল আমাদের এখতিয়ারে। কিন্তু এখন আমরা সব হারিয়ে দেউলিয়া। চালকের আসনে এখন পশ্চিমারা। আমরা সব কিছুর জন্য তাদের মুখাপেক্ষী। তারা টেলিভিশন আবিষ্কার করে, আর আমরা ঘরে বসে দ্বিধাগ্রস্ত মনে বিতর্ক করি টিভি দেখব নাকি দেখব না, টিভি দেখা জায়েজ হবে নাকি হবে না, টিভি দেখলে পাপ হবে নাকি হবে না। তারা নির্মাণ করছে চলচ্চিত্র, নাটক, সঙ্গীত, শিল্পকলা; আর আমরা ঘরে বসে ফতোয়া দিচ্ছি এটা হারাম, ওটা হারাম। এভাবে শুধু ফতোয়াবাজী করে একটি সভ্যতার মোকাবেলা করা যায় না। সভ্যতার মোকাবেলা করতে পাল্টা সভ্যতার প্রস্তাব করতে হয়, সেই প্রস্তাবিত সভ্যতায় থাকতে হয় শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, চলচ্চিত্র সবকিছুই।
পৃথিবীতে আজ অবধি বহু সভ্যতার জন্ম হয়েছে, বিকাশ হয়েছে, আবার পতনও হয়েছে। আমার জানামতে, কোনো সভ্যতার পতন ওইসময় ঘটে যখন তার অনুসারীরা ও ধারক-বাহকরা স্থবিরতা ও কূপম-ূকতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, অযৌক্তিক কর্মকা-ে লিপ্ত হয় ও অশ্লীলতার প্রসার ঘটায়। ইসলামী সভ্যতার কথাই ধরুন- এর উত্থান ঘটেছিল বিপ্লবী চেতনার ভিত্তিতে। যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, কূপম-ূকতার বিরুদ্ধে, অযৌক্তিক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে, অন্ধত্বের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের অঙ্গীকার নিয়ে। যতদিন সে অঙ্গীকার মেনে জাতি সংগ্রাম চালিয়ে গেছে তারা ছিল অপরাজিত, পৃথিবীর নেতৃত্বের স্থানে উপবিষ্ট। কিন্তু ক্রমান্বয়ে এই জাতি নিজেরাই যখন অন্ধত্বের পর্যায়ে পর্যবসিত হলো, অযৌক্তিক কর্মকা-ে ব্যাপৃত হলো, সুলতান ও আমির ওমরাহগণ অবিশ্বাস্য ভোগবিলাসে গা ঢেলে দিল এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছেড়ে দিল তখন সেই স্থবির জাতি পরাজিত হলো, আর তাদের সাথে পরাজিত হলো তাদের সভ্যতাও।
কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ! আবারও নতুন সভ্যতার উত্থান ঘটবে। কারণ ইসলামী সভ্যতার মূল যে প্রাণপ্রদ্বীপ, সেটি আল্লাহ নিভে যেতে দেননি। আল্লাহ রব্বুল আলামিন পবিত্র কোর’আনকে হেফাজত করেছেন যার একটি শব্দ ও বর্ণও কেউ পাল্টাতে পারেনি আর পারবেও না। জাতি যখনই তাদের লক্ষ্য ফিরে পাবে, তারা পবিত্র কোর’আনকে অবলম্বন করে আবারও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে, আবারও প্রতিষ্ঠা করতে পারবে নতুন সভ্যতা যেখানে সঙ্গীত থাকবে, শিল্পকলা থাকবে, কাব্য থাকবে, নাটক থাকবে, চলচ্চিত্র থাকবে, শুধু অশ্লীলতা ও আল্লাহর নাফরমানি থাকবে না। ওই সভ্যতারই আগমনী সংকেত ধ্বনিত হচ্ছে হেযবুত তওহীদের কণ্ঠে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Leave A Reply

Your email address will not be published.