Ultimate magazine theme for WordPress.

সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবেলায় হেযবুত তওহীদের উদ্যোগ

মো. মোখলেসুর রহমান
যখন কোনো আদর্শ সেটা ধর্মই হোক বা বস্তুতান্ত্রিকই হোক, যদি তা মানুষের বাস্তব জীবনের সংকট দূর না করতে পারে তখন সেই আদর্শ টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়। ইউসুফ (আ.) এর যুগে মিশরে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। ঐ সময় মিশরীয়রা আমন দেবতার পূজা করত। সেই প্রচলিত ধর্মের ধর্মগুরুরা জাতিকে দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা করতে পারে নাই, এমন কি নিজেদেরকেও রক্ষা করতে পারে নাই। তাদেরকে রক্ষা করেছিলেন আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত একজন মানুষ। তিনি আল্লাহর দেখানো পথে তাঁর অনুসারীদেরকে পরিচালিত করলেন। জাতি রক্ষা পেল। ওই মন্দিরের ছোট বড় পুরোহিতও ইউসুফ (আ.) এর তৈরি করা শস্যভাণ্ডার থেকে শস্য নিয়ে প্রাণ রক্ষা করেছিল।

মুসা (আ.) এর সময় আল্লাহ যখন ধারাবাহিকভাবে গজব নাজিল করতে লাগলেন স্বভাবতই ফেরাউন তার ধর্মের বড় বড় পুরোহিতদের কাছে এর প্রতিবিধান চাইলেন। তারা তো অহঙ্কারী। তাই এটা তারা বলতে পারল না যে, এর সমাধান তাদের কাছে নেই। তারা বানিয়ে বানিয়ে যাহোক একটা কথা ফেরাউনকে বলতে থাকলো। কিন্তু কার্যত সেগুলো অসার প্রতিপন্ন হলো। আজকে যেমন করোনা নিয়ে আমাদের অনেক ধর্মনেতা যা যা বলেছেন সেগুলো তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে। অর্থহীন কথা বলে জাতিকে বিভ্রান্ত করার অপরাধে ফেরাউন তার রাষ্ট্রের ধর্মনেতা, বড় বড় পুরোহিতদের ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছিল যার বিবরণ ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

মহামারীর পরে দুর্ভিক্ষ হয়, খাদ্য সংকট হয় এটা যারাই ইতিহাস সচেতন তারা জানেন। অর্থনীতিবিদগণ তাই মহামারী পরবর্তী মন্দা থেকে উদ্ধার পাওয়ার পন্থা বলে দেন। এখনও এমন একটা সমস্যা জাতির সামনে উপস্থিত। গত চার মাস ধরে এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার হাত থেকে জাতিকে রক্ষার জন্য মাথা ঘামাচ্ছে যারা করণীয় নির্ধারণ ও জাতিকে পরিচালনার জায়গায় আছেন তারা। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই বিদেশ থেকে আমদানি করে ষোলো কোটি মানুষের অন্নসংস্থান সম্ভব না, আর এখন তো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিধি সংকুচিত হয়ে গেছে। খাদ্য সংকট মোকাবেলার জন্য খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে এটাই মূল কথা। আপনি আজকে যা চাষ করছেন তা খাবেন আজ থেকে ছয় মাস বা এক বছর পরে। তাই আজ আপনার ঘরে চাল আছে মনে করে অলস বসে থাকা হবে চরম বোকামি। আপনাকে ভাবতে হবে ছয়মাস পরের কথা।

কয়েকমাসের লক ডাউনে আমাদের দেশের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সরকার খাদ্য মজুদ থাকার এবং নানা রকম প্রণোদনা দিয়ে জাতিকে আস্বস্ত করে রাখতে চাইছে কিন্তু পাশাপাশি দুর্ভিক্ষের আশঙ্কায় এও বলে যাচ্ছে যেন এক খণ্ড জমিও অনাবাদী না থাকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কৃষি উৎপাদনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় নি কোনো সরকারি বেসরকারি সংস্থাকে। অনেকেই রাজনৈতিক বক্তব্যের মতো কৃষিবিপ্লব সাধনের আহ্বান জানিয়ে দায়িত্ব সমাপ্ত করেছেন, সরকার ঋণের অর্থ বরাদ্দ করে আমলাদের উপর তা বিতরণের দায়িত্ব দিয়ে ভারমুক্ত হয়েছেন। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে সেই অর্থ গরিবের হাতে পৌঁছবে না এটা সকলেই বোঝেন, অভিজ্ঞতাও তেমনটাই বলে। সরকারেরও এটা বিলকুল জানা আছে। তাই লক ডাউন শিথিল করে দেওয়া হয়েছে যেন খেটে খাওয়া মানুষ নিজেদের দায়িত্বে কাজ করে খেতে পারেন, রোগশোক যা হয় দেখা যাবে। স্বাস্থ্যবিভাগ তো শুরু থেকেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। অথচ কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে দুই কোটির মতো। লেনদেন বন্ধ, ফলে আয়রোজগারও বন্ধ।

কিন্তু আমরা হেযবুত তওহীদ ত্রাণ, অনুদান, প্রণোদনার আশায় বসে থাকি নি। আমরা প্রকৃত ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত, অনুপ্রাণিত। প্রচেষ্টাহীন দোয়া ও পরকালের জন্য সওয়াব সঞ্চয় হেযবুত তওহীদের শিক্ষা নয়। বাস্তব সংকটের বাস্তব সমাধানই হচ্ছে এর আদর্শের মূল অভিপ্রায়। তাইতো জাতির নেতা মাননীয় এমাম জনাব হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমের আহ্বান সাড়া দিয়ে অত্যাসন্ন খাদ্যসংকটকে মোকাবেলা করতে হাজার হাজার হেযবুত তওহীদ কর্মী তাদের পেশা ও জীবনকে পরিবর্তন করে কৃষি বিপ্লব ঘটাতে নেমে পড়েছেন মাঠে। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা হেযবুত তওহীদের সদস্যদের যার যতটুকু জমি আছে সেগুলোকে চাষাবাদের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। বাড়ির আঙিনায়, বাড়ির আশেপাশে পড়ে থাকা জমিটুকুও তারা আর অনাবাদি ফেলে রাখছেন না। যাদের জমি নেই তারা অনেকেই বাড়ির ছাদে ছাদকৃষির উদ্যোগ নিয়েছেন। নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই কৃষিকাজে তাদের মাথার ঘাম পায়ে ঝরাচ্ছেন।

কেবল জমিতেই নয়, মাছ চাষেরও ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে হেযবুত তওহীদ। মজা পুকুর ও অব্যবহৃত দিঘিকে মাছ চাষের উপযোগী করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই সফলতার মুখ দেখেছে বহু মৎস্য প্রকল্প। মাছের জৈব খাদ্যের যোগানের পাশাপাশি মানুষের আমিষের চাহিদা মেটাতে নেওয়া হয়েছে সমন্বিত হাঁস ও মৎস্য চাষ প্রকল্প। গড়ে তোলা হয়েছে গরুর খামার যেখানে সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে গুরুকে স্বাস্থ্যবান করে তোলা হচ্ছে। আমাদের খামারে গরুর দেহে স্টেরয়েড বা অন্য কোনো প্রকার রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয় না। গরুর বর্জকে কাজে লাগিয়ে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের মাধ্যমে উৎপাদন করা হচ্ছে জ্বালানি গ্যাস যা রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

করোনার ফলে যে দুর্ভিক্ষ আসন্ন তাতে হেযবুত তওহীদের সদস্যদেরকে যেন কারো মুখাপেক্ষী না হতে হয়, বরং তারা যেন অন্যদেরও কর্মসংস্থান করে দিতে পারেন এজন্য আরো কিছু ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। গার্মেন্টস, ফুড এন্ড বেভারেজ ফ্যাক্টরি, স্কুল, কোচিং সেন্টার, জুতা তৈরির কারখানা, চুল কাটার সেলুন, মনোহারি দোকান, চিকিৎসালয়, লন্ড্রি, পরিবহন, খাবার হোটেল, ফার্নিচারের দোকান, ওয়েল্ডিং এর দোকান ইত্যাদি বহুবিধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসংস্থান লাভ করেছেন ও প্রশিক্ষিত হচ্ছেন বহু সদস্য-সদস্যা।

আমরা আশা করি, আমাদের এই কৃষি উদ্যোগ সফল হবে এবং এই প্রয়াস জাতিকে পরিশ্রম করে তার ভাগ্য বদলাতে উদ্বুদ্ধ করবে। আমাদের এই কাজ আমরা করছি আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলাম দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে। আমাদের এই প্রচেষ্টা এটাই প্রমাণ করবে যে ইসলাম কেবল ফতোয়াবাজির নাম নয়, আনুষ্ঠানিক উপাসনাসর্বস্ব ধর্ম নয়। ইসলাম জীবনের নাম, প্রগতির নাম, সকল সমস্যার সমাধানের নাম।

(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
যোগাযোগ: ০১৭৮৭৬৮২০২৫, ০১৬৭০১৭৪৬৪৩, ০১৬৭০১৭৪৬৫১, ০১৭১১০০৫০২৫]

Leave A Reply

Your email address will not be published.