Ultimate magazine theme for WordPress.

মেহেরপুরের গাংনীতে বিনা চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ

মেহেরপুর প্রতিনিধি:
মেহেরপুেরর গাংনী হাসপাতালে অনেকটা বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন করোনা উপসর্গ নিয়ে আসা রেজাউল আলম (৭০) নামের এক বৃদ্ধ। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার আশ্বাসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে এগারটার দিকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসলেও করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ড নামের কোন কিছু চোখে পড়েনি। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক কিছুক্ষণ চেষ্টা করলেও বাঁচাতে পারেননি রেজাউল আলমকে।

করোনা উপসর্গ নিয়ে শ্বাসকষ্টে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানান জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক। রেজাউল আলমের মৃত্যু ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নানা অব্যবস্থাপনায় ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে ছাত্রলীগসহ স্থানীয় মানুষের মনে। রেজাউল আলম গাংনী উপজেলার ঢেপা গ্রামের মৃত ইয়াসিন আলীর ছেলে।

মেহেরপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মুনতাসির জামান মৃদুল ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জুবায়ের হোসেন উজ্জ্বল জানান, করোনা উপসর্গ নিয়ে রেজাউল আলম বাড়িতে চিকিৎসা পাচ্ছেন না এমন খবর পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা রাশেদ হাসান শাওনকে অবগত করা হয়। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিপোর্ট সেন্টারে ১০ বেডের আইসোলেশন সেন্টার আছে সেখানে রোগী ভর্তি করা হবে বলে আশ্বাস দেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তাঁর আশ্বাসে রেজাউল আলমকে বাড়ি থেকে গাংনী হাসপাতালে নিয়ে আসেন ছাত্রলীগের স্বেচ্ছাসেবক ইউনিটের কর্মীরা। তবে নিপোর্ট সেন্টারে রোগীর চিকিৎসার মতো কোনো ব্যবস্থা এবং চিকিৎসক না পেয়ে বিপাকে পড়েন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। অপরদিকে হাসপাতালে করোনা আইসোলেশন না থাকায় জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বিপাকে পড়েন। এমন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা ছিল না তাদের হাতে।

এদিকে রেজাউল আলমের শ্বাসকষ্ট বাড়ছিল। নিরুপায় হয়ে তারা ডাক্তার এমকে রেজাকে নিয়ে আসেন। তখন রেজাউল আলমকে হাসপাতালের তিনতলায় লেবার ওয়ার্ডে রেখে অনেকটা জোর পূর্বক অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা করেন নেতাকর্মীরা।

নেতাকর্মীরা জানান, ডাক্তার রেজা ওই রোগীকে অক্সিজেন ও অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়ার পর কিছুটা সুস্থ বোধ করেন তিনি। রোগীর শারীরিক অবস্থা ভাল দেখে নেতাকর্মীরা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যান।

নেতাকর্মীরা জানান, যেখানে রেজাউল আলমকে আমরা রেখে আসি সেখানে রোগী রাখার মত কোন পরিবেশে ছিল না। পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। এত রাতে অন্য কোন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো পরিবেশ হয়নি বিধায় নিরুপায় হয়ে ওখানেই তাকে রাখা হয়েছিল।

রেজাউল আলম কে রেখে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে নেতাকর্মীরা হাসপাতালে ছুটে যান এবং ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

তারা জানান, হাসপাতালে করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ড এর ১০ বেড চালু আছে বলে বারবার নিশ্চিত করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার রাশেদ হাসান শাওন। অথচ হাসপাতালে গিয়ে কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি কেন গাংনীর মানুষের জীবন নিয়ে এই ধরনের মশকরা করছেন ? প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিতে পেরে রেজাউল আলমের স্বজনদের পাশাপাশি কান্নায় ভেঙে পড়েন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু দেখিয়ে সরকারি অর্থ পকেটস্থ করছেন কি না ? তা খতিয়ে দেখে এবং রোগী মৃত্যুর ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।
তবে এই ঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বরণ করা রেজাউল আলমের দাফন কাফনের ব্যবস্থা স্বাস্থ্যবিধি মেনে ছাত্রলীগের স্বেচ্ছাসেবী ইউনিটের কর্মীরা সম্পন্ন করবেন বলে জানান জেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক।

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার দুপুরে গাংনী হাসপাতাল কম্পাউন্ডে প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন মহেশপুর গ্রামের এক কৃষক। করোনা আইসোলেশন চালু না থাকায় জরুরি বিভাগে কর্মরত চিকিৎসকরা তার চিকিৎসা দিতে পারেননি। এর পরেও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা দাবি করে আসছেন করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু আছে। ফলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে গাংনীর বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ।

গাংনী হাসপাতালের একটি সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে যোগদান করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে রাশেদ হাসান শাওন। তাঁর যোগদানের অনেক আগে থেকেই করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু ছিল। পুরাতন ভবন সংস্কারের কাজ চলায় বেশ কয়েক মাস আইসোলেশন ওয়ার্ড বলে কিছু নেই। তাহলে কোন ফায়দা লুটে নেয়ার জন্য তিনি কাগজ-কলমে আইসোলেশন চালু দেখাচ্ছেন? এমন প্রশ্ন হাসপাতালে কর্মরত অনেকের।অপরদিকে আইসোলেশন ওয়ার্ড চালানোর মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীও নেই হাসপাতালে। যে কয়জন চিকিৎসক রয়েছেন তারা ইনডোর এবং আউটডোর সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। এর মধ্যে একজন চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত হয়ে হোম আইসোলেশনে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু আছে বলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বারবার বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্থানীয় সমাজকে বিপাকে ফেলছেন। আইসোলেশন চালু আছে ভেবে অনেক রোগী ভর্তি হতে যাচ্ছে হাসপাতালে। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিতে পারায় রোগীর স্বজনদের সাথে বাকবিতণ্ডা এবং অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসোলেশন চালু করতে হলে বেশ কয়েকজন চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য কর্মচারী জরুরী ভিত্তিতে পদায়ন করা দরকার বলে মনে করছেন হাসপাতালে ভুক্তভোগী চিকিৎসকরা।

নিজেদের অসহায়ত্ব তুলে ধরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন চিকিৎসক বলেন, করোন উপসর্গ নিয়ে আসা কোন রোগীকে সাধারণ ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া যাবে না। কেননা তিনি যদি করোনা আক্রান্ত হয়ে থাকেন তাহলে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তাছাড়া উপসর্গ নিয়ে আসা এবং করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য যে সমস্ত সরঞ্জাম ও ব্যবস্থাপনা দরকার সেগুলো সাধারণ ওয়ার্ডে নেই। ফলে জরুরী বিভাগ কিংবা হাসপাতালে ইনডোরে উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া কোন অবস্থায় সম্ভব না। এ বিষয়টি বুঝতে না পেরে অনেক রোগীর স্বজনরা চিকিৎসকদের সাথে দুর্ব্যবহার করছেন। একদিকে বাড়তি ডিউটির চাপ অন্যদিকে রোগীর স্বজনদের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ গাংনী হাসপাতালে কর্মরত অনেকে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.