Date: December 06, 2025

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / স্বাস্থ্য / ভাঙা দাঁতের খোঁচা থেকেও হতে পারে মুখের ক্যান্সার - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

ভাঙা দাঁতের খোঁচা থেকেও হতে পারে মুখের ক্যান্সার

November 28, 2025 08:27:23 PM   অনলাইন ডেস্ক
ভাঙা দাঁতের খোঁচা থেকেও হতে পারে মুখের ক্যান্সার

মুখের ভেতরের ভাঙা বা ধারালো দাঁতের ক্ষতকে অনেকেই উপেক্ষা করেন। তবে জিহ্বা বা গালে বারবার লাগা সামান্য ক্ষতও দীর্ঘ সময় ধরে থাকলে নীরবে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক, অ্যালকোহল জাতীয় দ্রব্যের নিয়মিত ব্যবহার এবং সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে দেশে ওরাল ক্যান্সারের ঝুঁকি ও মৃত্যুহার ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডেন্টাল অনুষদের ডিন ও ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ এই বিষয়ে বলেন, মুখে ক্ষত বা ঘা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ হলো ‘অ্যাপথাস আলসার’, যা মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি, হরমোনের পরিবর্তন, ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব, বা ব্রাশের খোঁচা ও খাওয়ার সময় অনিচ্ছাকৃত কামড় লাগার কারণে হতে পারে। এটি সাধারণত ৫–৭ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। এই ধরনের ক্ষতের জন্য সামান্য ব্যথানাশক জেল বা মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে স্বস্তি পাওয়া যায়।

তবে সব ক্ষতই সাধারণ নয়। ডা. সায়ন্থ বলেন, কিছু ক্ষত শরীরের অন্য রোগের লক্ষণ হিসেবে প্রকাশ পেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যক্ষ্মা রোগীদের ক্ষেত্রে ‘টিউবারকুলাস আলসার’, সিফিলিস রোগীদের ‘সিফিলিটিক আলসার’, এবং হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস সংক্রমণের কারণে জ্বরঠোসা বা ফোসকা থেকেও মুখে ক্ষত হতে পারে। এছাড়া কিছু ক্ষত আছে, যা ‘প্রি-ম্যালিগন্যান্ট লেসন’ বা ক্যান্সারের পূর্বাবস্থার ক্ষত হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লিউকোপ্লাকিয়া (সাদা ঘা), এরিথ্রোপ্লাকিয়া (লালচে ঘা), লাইকেন প্ল্যানাস (এলপি) এবং ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস (ওএসএমএফ)।

ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস (ওএসএমএফ) মূলত সুপারি খাওয়ার কারণে হয়। দীর্ঘসময় ধরে মুখে সুপারি রাখলে বা পানের সঙ্গে সুপারি চিবালে মুখের ভেতরের পাতলা মিউকাস ঝিল্লির নিচের অংশ ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়। এটি টান দেওয়া রশির মতো শক্ত হয়ে গেলে মুখ খুলতে সমস্যা হয় এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া লাইকেন প্ল্যানাস রোগে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ক্ষত নিয়ন্ত্রণ করা আরও জটিল হয়ে পড়ে।

মুখের ক্যান্সারের প্রধান কারণ হলো ধোঁয়াবিহীন তামাক বা চিবিয়ে খাওয়া তামাকজাত দ্রব্য যেমন- গুল, জর্দা, সাদা পাতা ও খৈনি। পানের সঙ্গে জর্দা বা সাদা পাতা খাওয়ার অভ্যাসও ঝুঁকি বাড়ায়। ধূমপান, অ্যালকোহল সেবন এবং হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) সংক্রমণও মুখের ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।

দাঁতের যত্ন না নেওয়াও ঝুঁকি বাড়ায়। অনিয়মিত ব্রাশ করা বা ভাঙা দাঁত থাকলে জিহ্বা ও গালের ভেতরে বারবার আঘাত পড়তে পারে। এতে ছোট ক্ষত তৈরি হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। পুষ্টিহীনতা, বিশেষ করে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ সবুজ শাক-সবজি ও ফলের অভাবও ঝুঁকি বাড়ায়।

মুখের ঘা সাধারণ ক্ষত নাকি ক্যান্সার তা নির্ণয় করা সম্ভব। সাধারণভাবে অ্যাপথাস আলসার এক সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। কিন্তু যদি ক্ষত ১০ দিনের বেশি স্থায়ী হয় এবং সাধারণ চিকিৎসায় ভালো না হয়, তবে তা অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডেন্টাল সার্জন বা হেড-নেক সার্জনের কাছে দেখানো উচিত। প্রয়োজন হলে বায়োপসি ও অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে তা ক্যান্সারজনিত কি না নির্ধারণ করা হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে মুখের ক্যান্সার ধরা পড়লে সামান্য সার্জারি দিয়েই রোগী সুস্থ হতে পারেন। তবে দেরি হলে রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির প্রয়োজন হয়, এবং শেষ পর্যায়ে ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে গেলে অপারেশনও ফলপ্রসূ হয় না। ক্যান্সারের আকার বড় হলে মুখের প্রতিস্থাপন করতে বুক, হাত বা পা থেকে মাংস ও হাড় আনা প্রয়োজন হয়, যা রোগীর কষ্ট ও চিকিৎসার খরচ চরম বাড়িয়ে দেয়।

ডা. সায়ন্থ উল্লেখ করেন, দেশে সঠিক রেফারেল সিস্টেমের অভাব রয়েছে। অনেক রোগী প্রথমে সাধারণ চিকিৎসকের কাছে যান, যিনি মলম বা ভিটামিন দিয়ে চিকিৎসা করেন। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। রোগীকে দ্রুত ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জন বা হেড-নেক বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো প্রয়োজন। এছাড়া ক্যান্সারে ভয়ে বা অজ্ঞতাবশত আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথিক বা টোটকা চিকিৎসার শরণাপন্ন হওয়া বিপজ্জনক।

ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ বলেন, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন এবং বিডিএস ডিগ্রি ছাড়া কেউ ডাক্তার হিসেবে প্র্যাকটিস করতে পারেন না। তবে বাস্তবে অনেক হাতুড়ে ডাক্তার রোগীদের ভুল চিকিৎসা দিচ্ছেন। তাই চিকিৎসক নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিশ্চিত হতে হবে যে তিনি সত্যিই বিডিএস ডিগ্রিধারী। সরকারি হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজে অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জনের সেবা কম খরচে বা বিনামূল্যে পাওয়া যায়।

মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা ও নিয়মিত দাঁতের যত্ন অপরিহার্য।