Date: May 01, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / বিশেষ নিবন্ধ / পন্নী পরিবারের শিকড়: কররানি রাজবংশের গৌরবগাথা - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

পন্নী পরিবারের শিকড়: কররানি রাজবংশের গৌরবগাথা

April 27, 2026 09:40:42 PM   অনলাইন ডেস্ক
পন্নী পরিবারের শিকড়: কররানি রাজবংশের গৌরবগাথা

রিয়াদুল হাসান 
গৌড়ের রাজ দরবারে চাচা কুতুব খানের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে সুলতান তাজ খান কররানির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন যুবক ঈসা খাঁ ও ইসমাইল খাঁ।

আফগানরা চিরকালই ভীষণ স্বাধীনচেতা ও জাত্যাভিমানি। একবার আফগানিস্তানের কিছু লোক রসুলাল্লাহর দরবারে যান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। রসুলাল্লাহ তাদেরকে বলেন, তোমরা তো ফাতহান অর্থাৎ বিজয়ী। এই ফাতহান শব্দটিই পশতুন ভাষায় ‘পাঠান’ রূপ পরিগ্রহ করে। আফগান ও পাকিস্তান সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতি গোষ্ঠীগুলো ভারতবর্ষে পাঠান নামেই পরিচিত পায়। ভারতের সুলতানী যুগে আফগানিস্তান হয়েই মুসলিমরা ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিল। পাঠানরাও এই সময় ভারতে আসে এবং আফগান বংশোদ্ভূত অনেক রাজবংশ ভারতের রাজধানী দিল্লিসহ বিভিন্ন অঞ্চল শাসন করেন। আফগানদের পরে মুঘলরা ভারতের শাসক হন।

১৫২৬ সনে পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদীর পরাজয়ের পর আফগানরা আবার দিল্লির ক্ষমতায় আসার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। আফগান সেনাপতি শের শাহ সুরি প্রথমে ১৫৩৭ সালে বাংলা আক্রমণ করে হুসেন শাহী বংশের শেষ সুলতান নাসিরউদ্দিন নসরত শাহকে পরাজিত করে গৌড়ের সিংহাসনে বসেন। এরপর ১৫৪০ সালে কানৌজের যুদ্ধে সম্রাট হুমায়ূনকে পরাজিত করে তিনি দিল্লির সুলতান হন এবং আফগান সুরি বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ইতিহাসের এই পর্বে ভারত-বাংলার শাসনকার্যে পন্নী পরিবারের যোগসূত্র স্থাপিত হয়।

চিশতি তরিকার প্রখ্যাত সুফি সাধক খাজা গিসুদারাজ বন্দে নেওয়াজের পুত্র পন্নী কররানির দৌহিত্র ছিলেন জামাল খান কররানি। আকবরনামার ভাষ্যমতে, কররানিরা অশ্বারোহী সৈনিক অথবা অশ্ববিক্রেতা হিসাবে আফগানিস্তান থেকে ভারতবর্ষে আগমন করেছিলেন। যাত্রাকালে তাদের বাবা বলেছিলেন, ‘যদি হিন্দুস্তানের বাদশাহের দরবারে অদৃষ্ট প্রসন্ন না হয়, তাহা হইলে অশ্ব বিক্রয় করিয়া দেশে ফিরিয়া আসিও।’ কিন্তু তাদের ভাগ্য এতটাই প্রসন্ন হয়েছিল যে তারা অশ্ববিক্রেতা থেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান হয়ে যান। নিজ যোগ্যতাবলে জামাল খান কররানি শের শাহের দরবারে একজন উচ্চপদস্থ রাজস্ব কর্মকর্তা হয়ে যান। তাঁর উপাধি ছিল ‘সাহিব-ই-জামা’। তাঁর চার পুত্র তাজ খান, সুলায়মান খান, ইমাদ খান ও ইসমাইল খানও সেনাবাহিনীর অধিনায়ক হন। তাজ খান ও সুলায়মান খান ১৫৪০ সালে কনৌজের যুদ্ধে বাদশাহ হুমায়ুনকে পরাজিত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। খুশি হয়ে শের শাহ তাদেরকে যৌথভাবে বিহারের জায়গির দান করেছিলেন।

শের শাহের মৃত্যুর পর তার ছেলে ইসলাম শাহ সুরি (১৫৪৫-১৫৫৪) দিল্লির সুলতান হন। তার আমলেও কররানিরা বাংলা ও বিহারের গভর্নর ছিলেন। বড় ভাই তাজ খান প্রধানত কেন্দ্রীয় দরবারে থাকতেন, আর সুলায়মান খান নিজে বিহারে থেকে দায়িত্ব পালন করতেন। খাবাসপুর ছিল তার শাসনকেন্দ্র। কিন্তু ১৫৪৫ সালের দিকে সরাইল পরগনা অর্থাৎ ভাটির জমিদার দেওয়ান সুলায়মান খাঁ ইসলাম শাহ সুরির কেন্দ্রীয় আনুগত্য অস্বীকার করেন। ভাটি অঞ্চল বলতে মূলত পূর্ব বাংলার নদীবিধৌত নিম্নভূমি অঞ্চলকে বোঝায়, যার মধ্যে বর্তমান কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলসহ ঢাকা অঞ্চলের পূর্বাংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন ইসলাম শাহ সুরি সেনাপতি তাজ খান কররানি ও দরিয়া খানকে পাঠিয়ে বিদ্রোহ দমন করেন। দেওয়ান সুলায়মান খান প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত ও নিহত হন। এই ঘটনার পর তার দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র ঈসা খান ও ইসমাইল খানকে বন্দি করে তুরানি বণিকদের কাছে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা হয়।

Taz Khan Karrani & Isa Khaa-1
গৌড়ের রাজ দরবারে চাচা কুতুব খানের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে সুলতান তাজ খান কররানির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন যুবক ঈসা খাঁ ও ইসমাইল খাঁ (ছবি প্রতীকী)।

তাজ খান কররানি (১৫৬৪ - ১৫৬৫)
দিল্লীর সুলতান আদিল শাহ সুরির শাসনামলে (১৫৫৪-১৫৫৬) সুরি সাম্রাজ্যে চরম অরাজকতা দেখা দিলে তাজ খান কররানি তাঁর ভাইদের সহযোগিতায় গাঙ্গেয় দোয়াব অঞ্চলে অর্থাৎ বর্তমান উত্তরপ্রদেশে নিজস্ব শক্তি গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে সুরি শাসনের পতনের পর তিনি ১৫৬৪ সালে বাংলার সুলতান তৃতীয় গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহকে হত্যা করে গৌড় দখল করেন এবং বাংলায় কররানি শাসনের সূচনা করেন। তাঁর দরবারে দেওয়ান সুলায়মান খানের ভাই কুতুব খান গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করেন। তাজ খানের সঙ্গে আলোচনা করে এবং প্রচুর অর্থের বিনিময়ে কুতুব খান তার দুই ভাতিজাকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে বাংলায় ফিরিয়ে আনেন। এরপর ঈসা খাঁ চাচার সহায়তায় পিতার জমিদারি সরাইল ফিরে পান। পরবর্তীকালে তিনি ইতিহাসখ্যাত বারো ভূঁইয়ার প্রধান নেতা হিসেবে মুঘল আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৫৬৪ সালে তাজ খান কররানি বাংলার সুলতান হওয়ার পর গৌড়ের প্রশাসন তার ভাই সুলায়মান খান কররানির হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজে বিহারের হাজীপুর অঞ্চলে যান। সেখানে কোকার নামে একটি আফগান/পাঠান গোষ্ঠী বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তাজ খান এই বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে আহত হন এবং অল্পকালের মধ্যে ১৫৬৫ সালে মারা যান। ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় আজও কেল্লা তাজপুর নামে একটি প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। নিউ নেশন পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, তাজ খান কররানি কোনো একটি যুদ্ধের সময় সংকটে পড়লে এই দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই থেকে এই এলাকা তাজপুর নামে খ্যাত হয়। ঐতিহাসিক বাদাউনি তাঁকে আফগানদের মধ্যে সবচেয়ে বিজ্ঞ ও শিক্ষিত ব্যক্তি বলে অভিহিত করেন।

হজরত-ই-আলা মিঞা সুলায়মান খান কররানি (১৫৬৫ - ১৫৭২)
কররানি বংশের সবচেয়ে শক্তিমান শাসক ছিলেন সুলায়মান খান কররানি। ১৫৬৫ সনে বড় ভাই তাজ খানের মৃত্যুর পর তিনি বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত হন। প্রথমেই তিনি বাংলার রাজধানী গৌড় থেকে ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে গঙ্গার অপর পারে তাণ্ডায় স্থানান্তর করেন। গৌড়ের আবহাওয়া প্লেগ মহামারীর কারণে মানুষ ও পশুপাখির জন্য অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছিল। পাশাপাশি, শাসকদের মধ্যে পরপর বহু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ায় শহরটিকে অশুভ বলে মনে করা হতে থাকে। 

আফগান সুর বংশের পতনের পর মুঘলরা উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করায় অনেক আফগান যোদ্ধা বাংলায় আশ্রয় নেন। সুলায়মান তাদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। ঐতিহাসিক জন স্টুয়ার্ট এর বর্ণনা অনুসারে সুলায়মানের সেনাবাহিনীতে ছিল ৩,৬০০ যুদ্ধ হাতি, ৪০,০০০ অশ্বারোহী, ১৪,০০০ পদাতিক, ২০,০০০ কামান ও কয়েকশ রণতরী। তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব এড়াতে তার প্রতি খোতবায় নামমাত্র আনুগত্য প্রদর্শন করে, উপঢৌকন পাঠিয়ে কার্যত স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করেন। তিনি সুলতানের পরিবর্তে হজরত-ই-আলা উপাধি ধারণ করেন, যার অর্থ ‘সর্বোচ্চ নেতা’ এবং নিজের নামে মুদ্রা প্রচলন থেকে বিরত থাকেন।

তিনি ছিলেন একজন পরাক্রমশালী ও দক্ষ যোদ্ধা এবং নিজেই তাঁর সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দিতেন। তাঁর বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা ও প্রধান সেনাপতি ছিলেন আমির উল ওমরা লোদি খান। সুলায়মান খান তাঁর দুই পুত্র- বায়াজীদ খান কররানি ও দাউদ খান কররানিকে তিনি যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী করে গড়ে তোলেন এবং পরবর্তীতে তাঁদেরকে বিশাল বাহিনীর সিপাহসালারের দায়িত্ব অর্পণ করেন। 

১৫৬৮ সালে কটক বিজয়ের পর বাংলা সালতানাতের সেনাবাহিনী রাজধানীতে প্রবেশ করছে; অগ্রভাগে রয়েছেন দুর্র্ধষ সেনাপতি কালাপাহাড় ও রাজপুত্র বায়াজীদ খান কররানি। বায়াজীদ খান কররানির পুত্রই পরবর্তীকালে টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদারির প্রতিষ্ঠা করেন।

কররানি রাজবংশের অন্যতম শক্তিশালী ও দুর্র্ধষ সিপাহসালার ছিলেন কালাপাহাড় (১৫৩৪-১৫৮০)। তিনি এক বনেদি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তবে নিজ সম্প্রদায়ের প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক বর্ণবৈষম্যমূলক রীতিনীতির প্রতি তিনি বিরূপ হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে সুলায়মান খানের সেনাবাহিনীতে ফৌজদার হিসাবে যোগদানের পর ইসলামের বর্ণবাদবিরোধী ও সাম্যের নীতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ধর্মান্তরের পূর্বে তাঁর নাম ছিল রাজীব লোচন রায় ওরফে রাজু। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি মুহাম্মদ ফার্মুলি নাম গ্রহণ করেন। কিন্তু বাংলার ইতিহাস তাকে কালাপাহাড় নামে চেনে। সুলায়মান খান কররানি তাঁর নিজের আদরের কন্যা দুলারিকে কালাপাহাড়ের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। ১৫৬৮ সালে তার পুত্র বায়াজীদ খান কররানি ও সেনাপতি কালাপাহাড় স্বাধীন উড়িষ্যা রাজ্যের রাজা মুকুন্দদেবকে পরাজিত করেন ও রাজধানী কটক দখল করেন। সুলায়মান নিজে উড়িষ্যায় যান এবং সামরিক ঘাটি ও বন্দর তাজপুর দখল করেন। যুদ্ধকালে বিভিন্ন মন্দিরে হানা দিয়ে মুর্তি ভাঙার বিষয়ে কালাপাহাড়ের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করা হয়। কিন্তু সেগুলো হিন্দুত্ববাদী ঐতিহাসিকদের অতিরঞ্জন এবং অনেকাংশে ইতিহাসের বিকৃতি বলেই অনেক গবেষক মনে করেন। বাস্তবে মন্দির ধ্বংসের ঘটনাগুলোর কারণ ছিল সামরিক কৌশলগত পদক্ষেপ এবং নিজের হিন্দু সমাজ ও মন্দির থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অপমান। পরবর্তীতে তিনি কোচবিহার রাজ্য ও কামরূপ রাজ্য জয় করে বাংলার সীমানা বর্ধিত করেন।

বাংলা, উড়িয়া, কোচ ও অহমিয়া সাহিত্যে ও ইতিহাসে সেনাপতি কালাপাহাড়কে নিয়ে ব্যাপক চর্চা হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম মানুষ কবিতায় উচ্চারণ করেছেন,

কোথা চেঙ্গিস, গজনি-মামুদ কোথায় কালাপাহাড়;
ভেঙ্গে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা দেওয়া দ্বার!’

kalapahar-1
১৫৬৮ সালে কটক বিজয়ের পর বাংলা সালতানাতের সেনাবাহিনী রাজধানীতে প্রবেশ করছে; অগ্রভাগে রয়েছেন দুর্র্ধষ সেনাপতি কালাপাহাড় ও রাজপুত্র বায়াজীদ খান কররানি। বায়াজীদ খান কররানির পুত্রই পরবর্তীকালে টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদারির প্রতিষ্ঠা করেন (ছবি প্রতীকী)।

কালাপাহাড়কে উদ্ধৃত করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উপন্যাস রচনা করেছেন নুরুল হক চৌধুরী, রসিকচন্দ্র বসু, সমরেশ মজুমদার, বিশ্বনাথ ঘোষ, কল্যাণ গুপ্ত ও সুজন ভট্টাচার্য। নাটক লিখেছেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ, কবিতা লিখেছেন মোহিতলাল মজুমদার, নকুল কুমার প্রমুখ।

সুলায়মান খানের শাসিত অঞ্চল বর্তমানের পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, বিহারের অর্ধেক এবং উড়িষ্যার বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল যার মোট আয়তন ছিল প্রায় ৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি। তাঁর সুশাসনে বাংলা সালতানাত সর্বোচ্চ উন্নতি লাভ করে। তাই এ আমলকে মুঘল বিজয়ের আগের বাংলার সালতানাতের স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে। এ সময় সিজার ফ্রেডরিক ও ভিনসেন্ট লিব্লাঙ্ক নামে দুইজন ভেনিসের বণিক বাংলার অন্যতম বাণিজ্যিক ঘাঁটি সন্দ্বীপে আসেন, যাঁরা পরে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিবরণী লিপিবদ্ধ করেন। সিজার ফ্রেডরিক লিখেছেন, “চট্টগ্রামে বিস্তর জাহাজ প্রস্তুত হইত। কনস্টান্টিনোপলের সুলতান আলেকজান্দ্রিয়ার জাহাজ অপেক্ষা চট্টগ্রামে নির্মিত জাহাজ পছন্দ করিতেন।”

সুলায়মান খান কররানি ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। ভিনদেশি বণিকেরা দেখতে পান, সন্দ্বীপ এলাকার মানুষ ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ করছে এবং প্রায় সবাই মুসলমান হয়ে গেছে। বড় ভাই তাজ খান কররানির অনুসরণে তিনি প্রতিদিন সকালে দেড়শত শায়েখ ও আলেমদের সঙ্গে ইবাদত-বন্দেগি, কুশল বিনিময় ও আলোচনায় অংশ নিতেন। এরপর তিনি রাজকার্য শুরু করতেন। পরে সম্রাট আকবরও তাঁর এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে শুরু করেন। তিনি অনেক মসজিদ, মাদ্রাসা, কাটরা বা মুসাফিরখানা নির্মাণ করে গেছেন যেগুলোর কিছু কিছু আজও দিনাজপুর, চট্টগ্রাম, পাণ্ডুয়া, মালদহের নানা স্থানে ভগ্নদশায় টিকে আছে। সেগুলোর শিলালিপিতে উৎকীর্ণ রয়েছে হজরত-ই-আলা সুলায়মান কররানির নাম। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চট্টগ্রামের বখশি হামিদ মসজিদ, বিহার শরিফের বড় দরগাহ, দিনাজপুরের দেওতলা মসজিদ ইত্যাদি।

সুলতান বায়াজীদ খান কররানি (১৫৭২-১৫৭৩)
টাঙ্গাইলের পন্নী বংশীয় জমিদারগণ ছিলেন এই কররানি বংশের উত্তরসূরী। ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিক শ্রী রসিকচন্দ্র বসু বিদ্যাবিনোদ তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছেন যে, সুলায়মান খান কররানি মুঘল অধ্যুষিত এলাকা থেকে দূরে, ঢাকা থেকে মধুপুর গড় হয়ে সুনামগঞ্জের কড়ইবাড়ী পর্বত, অর্থাৎ মেঘালয় পর্যন্ত বিস্তৃত মুসলিম ইতিহাসে ‘কোহেস্তানে ঢাকা’ নামে পরিচিত জঙ্গলময় পাহাড়ি অঞ্চলে নিজের রাজধানী স্থাপনের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। সেখানে গোবিন্দপুর নামের একটি এলাকায় তিনি শহর গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি পূর্ব বাংলায় রাজধানী না করে তাণ্ডায় রাজধানী নির্মাণ করেন। পূর্ববাংলার শাসনভার তিনি পুত্র বায়াজীদ খান কররানির হাতে অর্পণ করেন। গড় অঞ্চল অস্বাস্থ্যকর হওয়ায় বায়াজীদ খান টাঙ্গাইলে এসে নিজের নামে ‘বায়াজীদপুর’ গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করেন। আদি টাঙ্গাইলে অবস্থিত এই গ্রামটির বর্তমান নাম ‘বাজিতপুর’, যেখানে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ির হাট বসে। বায়াজীদ খান যেহেতু খাজনা আদায় করতেন তাই লোকেরা তাকে বাইজ খাঁ চৌধুরী বলত। কিছুদিন পূর্বেও এই এলাকায় তাঁর রাজবাড়ীর অস্তিত্ব টিকেছিল।

1-11
করটিয়া জমিদারবাড়ির দাউদ মহলের আঙিনায় স্থাপিত পন্নী পরিবারের সুদীর্ঘ বংশলতিকার সামনে হেযবুত তওহীদের মাননীয় এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম অতিথিদের সঙ্গে হাজার বছরের ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করছেন (ছবি প্রতীকী)।

করটিয়া জমিদারবাড়ির দাউদ মহলের আঙিনায় স্থাপিত পন্নী পরিবারের সুদীর্ঘ বংশলতিকার সামনে হেযবুত তওহীদের মাননীয় এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম অতিথিদের সঙ্গে হাজার বছরের ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করছেন।

১৫৭২ সাল। সুলায়মান খান কররানির অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে বায়াজীদ খান রাজধানী তাণ্ডায় গমন করেন এবং পিতার মৃত্যুর পর বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন শাসন করতে পারেননি। সিংহাসনে আরোহণের মাত্র ছয় মাস পর চাচা ইমাদ খান কররানির পুত্র এবং আপন ভগ্নিপতি হাঁসু সিংহাসনের লোভে তাঁকে হত্যা করে। আড়াই দিন পরেই সেনাপতি লোদি খান ও বিশ্বস্ত অমাত্যরা হাঁসুকে বন্দী করে হত্যা করেন। এরপর তারা সুলায়মান খান কররানির কনিষ্ঠ পুত্র দাউদ খান কররানিকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন। তিনিই ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান, যিনি বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার্থে মুঘল সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাজমহলের প্রান্তরে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। করটিয়া জমিদারবাড়ীর ছোট তরফের ‘দাউদ মহল’ তাঁর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। বায়াজীদ খান কররানি স্বল্পকালীন রাজত্বের মধ্যেই আকবরের নাম বাদ দিয়ে নিজের নামে খোতবা পাঠ ও মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন।

বায়াজীদের জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ মোহাম্মদ তাণ্ডায় থাকতেন। তিনি পরবর্তীকালে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করেন। এদিকে বায়াজীদ খান কররানির স্ত্রী ও ছোট ছেলে সাঈদ খান পন্নী টাঙ্গাইলের বাজিতপুরে বাস করতে থাকেন। পরে সম্রাট আকবর সাঈদ খান পন্নীকে ঘোড়াঘাট ও সরকার বাজুহা অঞ্চলের জায়গির দান করেন। এর মাধ্যমেই টাঙ্গাইলে পন্নী জমিদারির ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৬০৯ সালে তাঁর নির্মিত আতিয়া মসজিদ আজও কররানি তথা পন্নী পরিবারের ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে বিদ্যমান। [লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক; যোগাযোগ: ০১৬৭০-১৭৪৬৪৩, ০১৬১৭-৩২৯৩৯২, ০১৭১১-০০৫০২৫]