


ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের দুই বোন জান্নাতুন নাঈম মারিয়া ও সানজিদা তাসকিন প্রিয়া—শৈশব থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে একসঙ্গে পথচলা। সেই বন্ধন এবার নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। বার কাউন্সিলের মৌখিক পরীক্ষায় একসঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে তারা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে আইনজীবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। তাদের এই সাফল্য শুধু পারিবারিক নয়, অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে অনেকের জন্য।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বার কাউন্সিলের মৌখিক পরীক্ষায় সারা দেশ থেকে ৮ হাজার ৫৯৯ জন প্রার্থীর সঙ্গে উত্তীর্ণদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন এই দুই বোন। দীর্ঘ অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা পেরিয়েছেন আইনের পেশায় প্রবেশের শেষ ধাপ।
দুই বোনের শিকড় ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে হলেও তাদের বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাজীবন কেটেছে একসঙ্গেই। একই স্কুল, একই কলেজ এবং পরে সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়াশোনা করেন তারা। মারিয়া ছিলেন ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী, আর প্রিয়া ছিলেন ১৭তম ব্যাচের।
বড় বোন মারিয়ার আইন পেশায় আসার পেছনে রয়েছে ছোটবেলার ন্যায়বোধ। অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদ করার প্রবণতা থেকেই তার মনে আইনের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বাবার কাছেও তিনি প্রায়ই প্রশ্ন তুলতেন—যা তিনি ছোট হয়েও বুঝতে পারেন, বড়রা কেন তা বুঝতে পারেন না। মেয়ের এই মানসিকতা দেখে তার বাবাও স্বপ্ন দেখতেন, একদিন মেয়ে আইনজীবী হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াবে। সেই স্বপ্নই আজ বাস্তব হয়েছে।
ছোট বোন প্রিয়ার অনুপ্রেরণার জায়গাটি ছিল একেবারেই কাছের—তার বড় বোন মারিয়া। তিনি জানান, মারিয়া সবসময়ই তাকে বুঝিয়েছেন যে আইন কেবল একটি পেশা নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। সেই অনুপ্রেরণাতেই আজ দুই বোন একসঙ্গে এই পেশায় নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন।
স্নাতক শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য তারা ভিন্ন পথ বেছে নেন। মারিয়া বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিউপি) থেকে এলএলএম সম্পন্ন করেন, আর প্রিয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করলেও তাদের লক্ষ্য ছিল এক এবং অভিন্ন।
মারিয়ার মতে, সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা পূরণের একটি সুযোগ। তিনি চান এমন একজন আইনজীবী হতে, যার উপস্থিতি মানুষের জীবনে আস্থা ও সাহস জোগাবে, বিশেষ করে যারা অধিকারবঞ্চিত।
তবে আইন পেশায় নারীদের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলো এখনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবুও আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে এসব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব বলেই বিশ্বাস তার।
অবসর সময়ে দুই বোনই বই পড়া, নতুন কিছু শেখা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে ভালোবাসেন। ব্যস্ততার মাঝেও পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময় তাদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান।
এই সাফল্যের পেছনে তারা কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা, মা-বাবা, পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি। তাদের এই অর্জন প্রমাণ করে—স্বপ্ন যদি এক হয়, তবে পথও এক হয়ে যায়।