


সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব শ্যামাপূজা (কালীপূজা) ও দীপাবলি আজ, সোমবার (২০ অক্টোবর)। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে প্রতি বছর এই দুই উৎসব পালিত হয়। অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার প্রতীক এ উৎসবের মাধ্যমে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জাগতিক অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে শুভ শক্তির আরাধনা করেন। শক্তি, শান্তি ও কল্যাণের দেবী শ্যামা বা কালী মায়ের আগমনে দেশজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
মূলত দীপাবলি হলো আলোর উৎসব—যেখানে প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করার মধ্য দিয়ে শুভ ও কল্যাণের প্রতীককে প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, অশুভ শক্তির বিনাশ ও সত্য-শুভের বিজয়ের প্রতীক এই দীপাবলি। হিন্দু ধর্মমতে, অন্ধকারের অন্তে আলোর উদ্ভাসনের বার্তা নিয়েই দীপাবলির আগমন ঘটে। ঘরে ঘরে, মন্দিরে, পথঘাটে সারি সারি প্রদীপ জ্বালিয়ে মানুষ প্রার্থনা করে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুখের।
শ্যামাপূজা বা কালীপূজার ঐতিহ্যও গভীর ও প্রাচীন। দেবী কালীর আরাধনার মূল উদ্দেশ্য হলো শক্তি ও সাহসের আহ্বান, অশুভের বিনাশ এবং ধর্মের প্রতিষ্ঠা। ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, দেবী কালী হচ্ছেন দেবী দুর্গারই রূপান্তর—ললাটের ক্রোধ থেকে তাঁর উদ্ভব। দুর্গা দেবী যেখানে উর্বরা শক্তি ও অন্নদাত্রী দেবী হিসেবে পূজিতা, সেখানে কালী হচ্ছেন প্রলয় ও ধ্বংসের শক্তির প্রতীক। তবু, তাঁর এই ধ্বংসরূপের মধ্য দিয়েই নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা জেগে ওঠে। শাস্ত্রমতে, দেবী কালীর ১১টি ভিন্ন রূপ রয়েছে—প্রতিটি রূপের রয়েছে নিজস্ব মাহাত্ম্য ও আরাধনা-পদ্ধতি।
শ্যামাপূজাকে অনেক স্থানে ‘মহানিশি পূজা’ বা ‘শ্যামাপূজো’ বলা হয়, কারণ এটি রাতের গভীরে অনুষ্ঠিত হয়। এদিন গৃহে ও মণ্ডপে মৃন্ময়ী প্রতিমা স্থাপন করে পূজা-অর্চনা করা হয়। কালী দেবীকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী বলে মনে করা হয়, তাই দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্মশানে মহাধুমধাম সহকারে শ্মশানকালী পূজা পালিত হয়।
উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের মন্দিরগুলো বর্ণিল সাজে সজ্জিত করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার ও সূত্রাপুর এলাকার কালীমন্দিরগুলোয় চলছে উৎসবমুখর পরিবেশ; প্রতিটি মণ্ডপে উপচে পড়া ভক্তসমাগম। একইভাবে রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির এবং বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দিরেও চলছে পূজার আয়োজন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
দীপাবলির আলোর উৎসব আর শ্যামাপূজার শক্তির আরাধনা—দুইয়ের মিলনে আজ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে আনন্দ, ঐক্য আর শুভ শক্তির বার্তা। এই উৎসব শুধু ধর্মীয় নয়, বরং মানবতার জাগরণের প্রতীক হয়ে প্রতি বছর মানুষকে অনুপ্রাণিত করে আলোর পথে, সত্যের পথে, শুভের পথে চলতে।